অপ্রকাশিত
"কিছু অনুভূতি প্রকাশ পায় না, শুধু গল্প হয়ে থেকে যায়..."
03/08/2026
গল্প ২
"অন্তিম অনুরাগ"
পর্ব–১
স্নেহা—নামটার মতোই মেয়েটা ছিল ভীষণ মিষ্টি। সব সময় মুখে লেগে থাকত এক টুকরো নির্মল হাসি। নিজের কষ্ট যতই থাকুক, সে চাইত তার আশেপাশের সবাই যেন ভালো থাকে। কারও মন খারাপ দেখলে নিজের হাসি দিয়ে সেই মন ভালো করার চেষ্টা করত। যেন সে নিজেই ছিল একটুকরো আলো।
আজ স্নেহার জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের শুরু। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন।
সকালে অনেক যত্ন করে তৈরি হলো সে। হালকা রঙের একটি সালোয়ার-কামিজ, খোলা চুল, চোখে সামান্য কাজল আর ঠোঁটে লাজুক হাসি। আয়নার সামনে নিজেকে একবার দেখে মৃদু হেসে বেরিয়ে পড়ল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল ক্যাম্পাসে আজ যেন উৎসবের আমেজ। চারদিকে নতুন মুখ, নতুন স্বপ্ন, নতুন গল্পের শুরু। সবাই একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, নতুন বন্ধু বানাচ্ছে। স্নেহাও খুব সহজেই সবার সঙ্গে মিশে গেল। তার প্রাণখোলা হাসি আর আন্তরিক ব্যবহার মুহূর্তেই অনেকের মন জয় করে নিল।
এভাবেই হাসি-আড্ডা আর নতুন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কেটে গেল তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিন।
দিনগুলো দ্রুত এগোতে লাগল।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো বিভাগে স্নেহা পরিচিত হয়ে উঠল তার ভদ্র ব্যবহার, মিষ্টি হাসি আর অসাধারণ ফলাফলের জন্য। প্রতিটি পরীক্ষাতেই সে সবার সেরা ফলাফলের তালিকায় থাকত।
তবে একজন ছিল, যে প্রতিবারই তাকে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে ফেলত।
শুভ।
ছেলেটা ছিল শান্ত স্বভাবের, ভদ্র, বুদ্ধিমান আর অসম্ভব স্মার্ট। অযথা কারও সঙ্গে মিশত না। ক্লাসে প্রয়োজন ছাড়া খুব একটা কথা বলত না। কিন্তু পড়াশোনায় ছিল অসাধারণ। প্রতিটি পরীক্ষায় স্নেহা আর শুভর মধ্যে মাত্র এক-দুই নম্বরের ব্যবধান থাকত। পুরো বিভাগের কাছে তারা ছিল একে অপরের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী।
একদিন একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাসাইনমেন্টের জন্য শিক্ষক সবাইকে কয়েকটি দলে ভাগ করে দিলেন।
স্নেহা একই দলে পড়ল তার দুই সবচেয়ে কাছের বন্ধু—মায়া আর রিমির সঙ্গে। সেই দলে আরও ছিল ফাহিম নামের এক প্রাণবন্ত ছেলে এবং দলের লিডার... শুভ।
দলের সদস্য হওয়ার পর থেকেই স্নেহা আর শুভর প্রায় প্রতিদিনই কথা বলতে হতো। কখনও লাইব্রেরিতে বসে কাজ, কখনও ফোনে আলোচনা, কখনও ক্যাম্পাসের বেঞ্চে বসে পরিকল্পনা।
প্রথমদিকে তাদের কথাবার্তা ছিল পুরোপুরি পড়াশোনা নিয়ে।
—"এই অংশটা তুমি করবে?"
—"হ্যাঁ, তবে এই তথ্যটা একটু চেক করে নিও।"
এভাবেই শুরু।
কিন্তু কেউই বুঝতে পারেনি, এই ছোট ছোট কথোপকথনের মাঝেই ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব।
স্নেহা বুঝতে পারল, শুভ আসলে যতটা চুপচাপ, ততটা কঠিন নয়। তার ভেতরেও আছে দারুণ রসবোধ আর এক ধরনের নির্ভরতা।
আর শুভও লক্ষ্য করল, স্নেহার হাসিটা শুধু সুন্দর নয়—ক্লান্ত মানুষকেও ভালো করে দেওয়ার মতো এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে সেই হাসির।
তারা তখনও জানত না...
একটা সাধারণ অ্যাসাইনমেন্টই একদিন তাদের জীবনের সবচেয়ে অসাধারণ গল্পের শুরু হয়ে উঠবে।
অশান্ত মন, গভীর অস্থিরতা, আর কোনো কিছুর প্রতিই ভালো লাগা নেই।
মনে বর্তমান অবস্থা। কেনো? কেনো? কেনো এমন লাগছে? সেটাও বুঝতে পারছি না। কারণ জানি না, তাই সমাধানও পাই না।
কোনো কাজেই মন নেই, করতেও পারি না।
যেহেতু নিজ থেকে কিছু করতে পারছি না, তাই জীবনে এমন কিছু হোক, যা পাল্টে দেবে সব।
শান্ত হোক মন, কমে যাক অস্থিরতা।
আসছে নতুন গল্প....
26/07/2026
গল্প ১
"৩.৩৩"
পর্ব ৩ (শেষ পর্ব)
নাহার হঠাৎই জ্ঞান ফিরে পেল।
সে নিজের ঘরেই ছিল।
কিন্তু তার ডান হাতে তখনও শক্ত করে ধরা সেই পুরোনো পকেট ঘড়ি।
সে হতবাক হয়ে গেল।
"এটা... তাহলে স্বপ্ন ছিল না?"
কাঁপা হাতে ঘড়িটার দিকে তাকাতেই সে লক্ষ্য করল, কাঁটাগুলো ধীরে ধীরে ঘুরছে।
৩:৩৩...
৩:৩৪...
৩:৩৫...
তারপর আবার হঠাৎ কাঁটাগুলো উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করল।
নাহার ভয়ে ঘড়িটা ফেলে দিল।
ঘড়িটা মেঝেতে পড়তেই ঘরের লাইট কয়েকবার জ্বলে নিভে উঠল।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
অচেনা একটি নম্বর।
নাহার কাঁপা হাতে কল রিসিভ করল।
ওপাশ থেকে কোনো কথা শোনা গেল না।
শুধু কারও হাঁপানোর শব্দ।
তারপর খুব ধীরে একটি কণ্ঠ বলল—
"আমাকে খুঁজো না..."
"আমাকে বাঁচাও।"
লাইন কেটে গেল।
---
পরদিন নাহার কলেজে গিয়েও স্বাভাবিক থাকতে পারল না।
ক্লাস শেষে লাইব্রেরিতে ঢুকে সে গত কয়েক মাসের সংবাদপত্র খুঁজতে লাগল।
ঘণ্টাখানেক পর একটি ছোট খবর তার চোখে পড়ল।
"নতুন ব্রিজ উদ্বোধন আগামী মাসে।"
নাহার জমে গেল।
সে বারবার খবরটা পড়ল।
তারপর জানালার বাইরে তাকাল।
অসম্ভব...
যে ব্রিজ থেকে ছেলেটি ঝাঁপ দিয়েছিল...
যে ব্রিজে সে নিজে দাঁড়িয়েছিল...
সেই ব্রিজ তো এখনো তৈরি-ই হয়নি!
তাহলে...
সে কোথায় গিয়েছিল?
---
বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে নাহার ইচ্ছে করেই সেই জায়গায় গেল।
সেখানে শুধু নির্মাণকাজ চলছে।
লোহার রড, সিমেন্ট আর শ্রমিক।
ব্রিজের অর্ধেকও তৈরি হয়নি।
নাহারের বুক কেঁপে উঠল।
সে ধীরে ধীরে পিছিয়ে আসছিল।
ঠিক তখনই...
একজন শ্রমিক তার দিকে তাকিয়ে বলল,
"আপা, সাবধানে যান।"
"কেন?"
"আগামী মাসে এখানে একজন ছেলে কাজ করতে আসবে।"
"তারপর?"
শ্রমিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"শুনেছি... উদ্বোধনের কয়েক দিন পর সে এই ব্রিজ থেকেই ঝাঁপ দেবে।"
নাহারের গলা শুকিয়ে গেল।
"আপনি কীভাবে জানেন?"
শ্রমিক অবাক হয়ে বলল,
"আমি তো কিছু বলিনি..."
"আপনি নিজেই তো একটু আগে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তারপর নিজেই উত্তর দিয়ে চলে গেলেন।"
নাহারের চোখ বড় হয়ে গেল।
সে তো এই কথাগুলো বলেনি!
তাহলে...
তার সঙ্গে কথা বলছিল কে?
ঠিক তখনই বাতাসে ভেসে এল সেই পরিচিত হাসি।
নাহার ঘুরে দাঁড়াল।
দূরে, অসমাপ্ত ব্রিজের ওপর...
সেই ছেলেটি দাঁড়িয়ে আছে।
এবার সে হাসছে না।
তার চোখে ভয়।
সে ঠোঁট নেড়ে শুধু একটি বাক্য বলল—
"আমি তোমার অতীত নই... আমি তোমার ভবিষ্যৎ।"
কথাটা শেষ হতেই...
সে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
নাহার স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
....
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতেই নাহারের ফুপি হাসিমুখে বললেন,
"নাহার, তোর জন্য একটা সম্বন্ধ এসেছে। আগে ছেলেটার ছবিটা দেখ।"
নাহার বিরক্ত হয়ে বলল, "এখন এসব দেখতে ভালো লাগছে না, ফুপি।"
"একবার দেখ না, পছন্দ না হলে না করে দিবি।"
অনিচ্ছায় ছবিটা হাতে নেয় নাহার।
ছবিটা দেখার সঙ্গে সঙ্গেই তার হাত কেঁপে ওঠে।
ছবিটা মেঝেতে পড়ে যায়।
তার ঠোঁট শুকিয়ে আসে।
"না... এটা হতে পারে না..."
কারণ ছবিতে থাকা ছেলেটা...
ঠিক সেই ছেলেটি।
যে তার স্বপ্নে এসেছিল।
যার সঙ্গে রাস্তায় ধাক্কা লেগেছিল।
আর...
যার রক্তাক্ত লাশ সে নিজের চোখে দেখেছিল।
ফুপি অবাক হয়ে বললেন, "কী হয়েছে?"
নাহার কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, "এই... এই ছেলেটার নাম কী?"
ফুপি হেসে বললেন, "নাম আরহাম। খুব ভালো ছেলে। ইঞ্জিনিয়ার। আগামী মাসে নতুন ব্রিজের প্রজেক্টে যোগ দেবে।"
নাহার বুঝতে পারল......
এই রহস্যের শুরু অতীতে নয়...
বরং এমন এক ভবিষ্যতে, যেটা এখনো ঘটেইনি।
আর এই ভবিষ্যৎ পরিবর্তন এর জন্যই নাহার বার বার এক জায়গায়, এক সময় এ ফিরে যাচ্ছে।
সমাপ্ত।
24/07/2026
গল্প ১
"৩.৩৩"
পর্ব ২
নাহার ভয়ে পেছাতে পেছাতে হঠাৎ লক্ষ্য করল...
চারপাশের সব শব্দ এক মুহূর্তে থেমে গেছে।
মানুষগুলো যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই স্থির হয়ে আছে।
কেউ নড়ছে না।
কেউ কথা বলছে না।
মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবীটা থেমে গেছে।
শুধু...
একজন নড়ছে।
কলেজের সেই মেয়েটি।
সে ধীরে ধীরে ভিড়ের মাঝখান দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নাহারের সামনে এসে দাঁড়াল।
তার ঠোঁটে সেই একই মুচকি হাসি।
সে নিচু স্বরে বলল,
"আজও ঠিক একই ঘটনা ঘটল..."
নাহার কাঁপা গলায় বলল,
"মানে...?"
মেয়েটি চোখ তুলে নাহারের দিকে তাকাল।
"তুমি আবারও ওকে বাঁচাতে পারলে না।"
নাহারের বুক ধক করে উঠল।
"আ... আবারও মানে?"
মেয়েটি কোনো উত্তর দিল না।
সে শুধু নিজের হাতঘড়িটার দিকে তাকাল।
ঘড়িতে সময়...
৩:৩৩।
এরপর সে ঘড়ির কাঁটা ঘুরিয়ে দিল।
চারপাশের সবকিছু ঝাপসা হয়ে যেতে লাগল।
নাহারের মাথা ঘুরে উঠল।
এক ঝটকায় সে আবার নিজেকে সেই ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল।
সামনে নীল আকাশ।
মিষ্টি বাতাস।
আর দূরে...
সেই একই ছেলেটি ধীরে ধীরে তার দিকে হেঁটে আসছে।
একই হাসি।
একই দৃষ্টি।
নাহার বুঝে গেল...
সে কোনো স্বপ্নে নেই।
সে একটা শেষ না হওয়া দিনের ভেতরে আটকে গেছে।
যতক্ষণ না ছেলেটাকে বাঁচাতে পারবে...
ততক্ষণ একই দিন, একই ব্রিজ, একই মৃত্যু বারবার ফিরে আসবে।
নাহারের মাথা তখনও ঝিমঝিম করছে।
চারপাশের মানুষজন, পুলিশের প্রশ্ন, অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন—সবকিছুই যেন তার কানে অস্পষ্ট লাগছিল।
সে শুধু একটাই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিল...
ছেলেটা কে?
আর কেন সে স্বপ্নে দেখেছিল এমন একটা ঘটনা, যা পরে হুবহু সত্যি হলো?
---
পরদিন নাহার আবার সেই ব্রিজে যায়।
এবার ভয়ের জন্য নয়...
উত্তর খুঁজতে।
সে আশেপাশের দোকানদার, চা-ওয়ালা, এমনকি ব্রিজের নিরাপত্তারক্ষীকেও জিজ্ঞেস করে।
"কাল যে ছেলেটা মারা গেল, ওকে চিনতেন?"
সবাই একই উত্তর দেয়।
"না আপা। আগে কখনো দেখিনি।"
কিন্তু একজন বৃদ্ধ হঠাৎ বলে ওঠেন,
"অদ্ভুত একটা ব্যাপার হয়েছে।"
নাহার তাড়াতাড়ি তার দিকে তাকায়।
"ছেলেটা পড়ে যাওয়ার আগে কয়েক সেকেন্ড... মনে হচ্ছিল সে কারও সঙ্গে কথা বলছে।"
"কার সঙ্গে?"
"আমরা কাউকে দেখিনি... কিন্তু সে বারবার তোমার দিকেই তাকাচ্ছিল।"
নাহারের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।
---
সেদিন রাতে নাহারের ঘুম এল না।
ভোরের দিকে কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিল, সে বুঝতেই পারেনি।
স্বপ্নে...
সে আবার সেই ব্রিজে।
কিন্তু এবার সবকিছু অন্যরকম।
ব্রিজটা পুরোনো।
রেলিংয়ে মরিচা।
আকাশ মেঘে ঢাকা।
দূরে দাঁড়িয়ে আছে সেই ছেলেটা।
তবে এবার তার মুখে কোনো হাসি নেই।
সে শুধু একবার বলল,
"এবারও দেরি করে ফেললে..."
কথাটা শেষ হতেই সব অন্ধকার।
---
পরদিন সকালে নাহার সিদ্ধান্ত নিল—সে পুলিশের কাছ থেকে কেসের তথ্য জানবে।
অনেক অনুরোধের পর একজন অফিসার শুধু একটি তথ্য জানালেন।
"আমরা ছেলেটার পরিচয় এখনো নিশ্চিত করতে পারিনি।"
"কোনো আইডি কার্ড?"
"না।"
"মোবাইল?"
"না।"
"ফিঙ্গারপ্রিন্ট?"
অফিসার কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললেন,
"সব ডাটাবেজে মিলিয়ে দেখেছি।"
"...কোথাও কোনো রেকর্ড নেই।"
নাহার অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
একজন মানুষের...
কোনো পরিচয়ই নেই?
---
সেদিন বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে নাহার আবার সেই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ...
তার চোখে পড়ল।
রাস্তার পাশে একটি পুরোনো ঘড়ির দোকান।
দোকানের কাঁচে ঝুলছে অনেক ঘড়ি।
কিন্তু...
সবগুলো ঘড়ির কাঁটা একই সময়ে থেমে আছে।
৩টা ৩৩ মিনিট।
ঠিক তখনই দোকানের ভেতর থেকে এক বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন।
তিনি নাহারের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
"শেষ পর্যন্ত তুমি এসেছ।"
নাহার বিস্ময়ে বলল,
"আপনি... আমাকে চেনেন?"
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
"আমি না..."
"সময় তোমাকে চেনে।"
নাহার কিছু বুঝে ওঠার আগেই বৃদ্ধ একটা পুরোনো পকেট ঘড়ি তার হাতে দিলেন।
ঘড়িটার পেছনে খোদাই করা ছিল মাত্র একটি বাক্য—
"ওকে বাঁচাও, নইলে সময় কখনো সামনে এগোবে না।"
নাহার কাঁপা হাতে ঘড়িটা খুলতেই...
হঠাৎ চারপাশের সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল।
তার কানে ভেসে এল সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর—
"এইবার... আমার নয়..."
"নিজেকে বাঁচাও।"
নাহার আতঙ্কে চারদিকে তাকাল।
কিন্তু সেখানে কেউ নেই।
শুধু দূরে...
ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছেলেটা।
সে এবার আর হাসছে না।
সে শুধু নাহারের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল।
আর নাহার বুঝতে পারল...
এটা কোনো সাধারণ মৃত্যু নয়।
কেউ একজন...
সময়কে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
আর সেই অসমাপ্ত সময়ের ভেতর আটকে গেছে নাহার।
চলবে...
22/07/2026
"৩.৩৩"
গল্প -১
পর্ব ১
এক সুন্দর মিষ্টি বিকেলে হাঁটতে বের হয় নাহার।
হাঁটতে হাঁটতে তার চোখ পড়ে একটি ব্রিজের ওপর। ব্রিজটি একদম নতুন, আর ভীষণ সুন্দর। কারণ, সেখানে দাঁড়িয়ে আকাশের অপরূপ দৃশ্য দেখা যেত। অনেকেই সেখানে বসে সময় কাটায়, আবার কেউ শুধু দাঁড়িয়ে আকাশ দেখে।
তাই নাহারও উঠে পড়ে ব্রিজে। উঠেই সে দেখে, তার কলেজের একটি মেয়ে সেখানে বসে আছে। তবে তাদের মধ্যে কখনো কথা হয়নি। তাই কেউই কারও সঙ্গে কথা বলল না।
নাহার ব্রিজের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মিষ্টি বাতাস আর সুন্দর আকাশের দৃশ্য উপভোগ করতে থাকে।
হঠাৎ তার চোখে পড়ে, একটি ছেলে ধীরে ধীরে ব্রিজে উঠে আসছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ছেলেটি গভীরভাবে তার দিকেই তাকিয়ে আছে এবং সোজা তার দিকেই এগিয়ে আসছে।
ছেলেটিকে দেখতে রোগা-পাতলা। মাথার একটু বড় চুলগুলো বাতাসে উড়ছে।
তবে তার হাসিটা ছিল একদম অন্যরকম... কেমন যেন রহস্যময়।
নাহার ছেলেটিকে লক্ষ্য করতে করতে একসময় দেখে, সে ঠিক তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। নাহার বিভ্রান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
ঠিক তখনই...
ছেলেটি হঠাৎ ব্রিজের কার্নিশে উঠে দাঁড়ায়।
এটা দেখে নাহার ভয়ে কাঁপতে থাকে। সে বারবার ছেলেটিকে নিচে নামতে বলে। কিন্তু ছেলেটি উল্টো কার্নিশের ওপর বসে পড়ে।
তারপর...
সে নাহারের দিকে তাকিয়ে সেই রহস্যময় হাসিটা দেয়।
নাহার কিছুই বুঝতে পারছিল না। তার মনে হচ্ছিল, খুব খারাপ কিছু ঘটতে চলেছে।
সে ভয়ে ভয়ে কয়েক পা পিছিয়ে যায়।
আর ঠিক তখনই...
ছেলেটি ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দেয়।
"না...!"
চিৎকার করে নাহার সামনে ছুটে যায় তাকে ধরার জন্য। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
ছেলেটি নিচে পড়ে যায়।
রক্ত ছিটকে এসে নাহারের শরীরে লাগে।
নাহার প্রাণপণে চিৎকার করতে থাকে। ভয়ে তার পুরো শরীর কাঁপছে। সে দ্রুত শ্বাস নিতে থাকে। বুক এত জোরে ধুকপুক করছিল যে, নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দও শুনতে পাচ্ছিল।
সে কাঁপতে কাঁপতে নিচে উঁকি দেয়।
ছেলেটি উপুড় হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু তার মুখটা পাশ ফিরে রয়েছে।
আর...
সে এখনো সেই ভয়ংকর, রহস্যময় হাসিটাই হাসছে।
নাহারের শরীর ঠান্ডা হয়ে আসে। নিজের গায়ে লেগে থাকা রক্তের দিকে তাকিয়ে তার ভয় আরও বেড়ে যায়।
চারপাশে মানুষজন চিৎকার করছে। সবাই দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিয়েছে।
নাহার স্থির হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে।
ঠিক তখনই...
তার মনে হয়, তার পাশে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে।
সে ধীরে ধীরে পাশ ফিরে তাকায়।
দেখে, কলেজের সেই মেয়েটি নিচে পড়ে থাকা লাশের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
তারপর...
মেয়েটি ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে নাহারের দিকে তাকায়।
আর সেই একই রকম ভয়ংকর, ক্রিপি হাসি হাসে।
এটা দেখে নাহার যেন জমে যায়।
সে কাঁদতে থাকে।
মেয়েটি ধীরে ধীরে সেখান থেকে চলে যেতে শুরু করে।
হঠাৎ...
নাহার জোরে চিৎকার দিয়ে উঠে বসে।
সে দেখে, সে নিজের বিছানায় রয়েছে।
তার পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে। সে হাঁপাতে হাঁপাতে পাশের গ্লাস থেকে পানি খায়।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে...
রাত ৩টা ৩৩ মিনিট।
ভয় এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তবে এটুকু ভেবে সে কিছুটা শান্তি পায় যে, সবটাই শুধু একটা দুঃস্বপ্ন ছিল।
পরদিন সকালে নাহার কলেজে যাওয়ার জন্য বের হয়।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে সে বারবার স্বপ্নটার কথা ভাবছিল।
কেন সেই কলেজের মেয়েটি একটা মৃতদেহ দেখে হাসছিল?
কেনই বা ছেলেটি মৃত্যুর মুহূর্তেও সেই অদ্ভুত হাসি হাসছিল?
এই প্রশ্নগুলো ভাবতে ভাবতেই তার মাথা যেন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একজনের সঙ্গে তার ধাক্কা লাগে।
দুজনেই মাটিতে পড়ে যায়।
নাহার নিজের জামা থেকে ধুলো ঝাড়ছিল।
তারপর...
সে যা দেখল, তাতে তার চোখ কপালে উঠে গেল।
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে...
স্বপ্নে দেখা সেই ছেলেটি!
হ্যাঁ, একদম সেই একই ছেলে।
নাহার ভয় আর বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
ছেলেটি নাহারের দিকে তাকিয়ে সেই একই ক্রিপি হাসিটা হেসে শুধু বলে,
"সরি।"
তারপর হেঁটে চলে যায়।
নাহার নিজের পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল।
সে বোঝার চেষ্টা করছিল...
এটাও কি কোনো স্বপ্ন?
না।
এটা স্বপ্ন নয়।
সে আবার হাঁটতে শুরু করে।
কিন্তু ভয়ে তার শরীর কাঁপছিল।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সে বুঝতে পারে, চারপাশটা তার কাছে অচেনা লাগছে।
সে যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, এই রাস্তা দিয়ে তো কলেজে যাওয়া যায় না!
সে সামনে এগোতে থাকে।
আর তারপর...
তার সামনে ভেসে ওঠে...
সেই ব্রিজ।
ঠিক স্বপ্নে দেখা ব্রিজটা।
নাহারের ভয় আরও বেড়ে যায়।
সে কাঁদতে কাঁদতে সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করে।
কিন্তু...
কী এক অদৃশ্য টানে সে আবার ব্রিজটার দিকেই এগিয়ে যায়।
কাছে গিয়ে দেখে, নিচে অসংখ্য মানুষ ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে।
সে ভিড় ঠেলে সামনে যায়।
তারপর...
সে যা দেখল...
তাতে তার পৃথিবীটাই যেন থেমে গেল।
একজন ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দিয়ে মারা গেছে।
চারপাশে শুধু রক্ত...
আর রক্ত...
নাহার একটু ভালো করে লাশটার দিকে তাকায়।
তারপরই...
সে ভয়ে চিৎকার করে ওঠে।
কারণ...
লাশটা আর কারও নয়।
সেই ছেলেটির।
যে ছেলেটিকে সে স্বপ্নে দেখেছিল।
যার সঙ্গে একটু আগেই রাস্তায় তার ধাক্কা লেগেছিল।
কিন্তু...
ছেলেটি তো উল্টো দিকে হেঁটে চলে গিয়েছিল।
তাহলে...
এখানে মৃত অবস্থায় পড়ে আছে কীভাবে?
নাহারের মাথার ভেতর হাজার হাজার প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে।
কিন্তু...
একটারও উত্তর তার কাছে নেই...
ছোট গল্প— ০১
রাতে ঠিক ২:১৭-এ একটা মেসেজ আসত।
"ঘুমিয়ে পড়েছ?"
প্রথম দিন মেয়েটা ভেবেছিল ভুল নম্বর।
দ্বিতীয় দিনও একই সময়।
তৃতীয় দিনে রিপ্লাই দিল—
"আপনি কে?"
ওপাশ থেকে উত্তর এল—
"যে তোমাকে প্রতিদিন দেখে।"
ভয় পেয়ে নম্বরটা ব্লক করে দিল সে।
পরদিন আবার নতুন নম্বর।
"ব্লক করলে কী হবে? আজও তো নীল জামাটাই পরেছ।"
মেয়েটার বুক কেঁপে উঠল।
সে পুলিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
বাড়ি ফিরে দরজা খুলতেই দেখল—
ঘরে কেউ নেই।
শুধু আয়নার ওপর লিপস্টিকে লেখা—
"আজও আমাকে খুঁজছ?"
কাঁপতে কাঁপতে আয়নার কাছে গেল।
হঠাৎ তার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা ডায়েরিতে।
প্রথম পাতায় লেখা—
"ডা. রাফি, আজও নীলা কল্পনা করছে কেউ তাকে অনুসরণ করছে। ওষুধের মাত্রা বাড়াতে হবে।"
মেয়েটা থমকে গেল।
ধীরে ধীরে ডায়েরিটা বন্ধ করল...
তারপর ফোনটা হাতে নিয়ে হাসল।
ঠিক ২:১৭ বাজতেই সে নিজেই নিজের নম্বরে মেসেজ পাঠাল—
"ঘুমিয়ে পড়েছ?"
— সমাপ্ত
18/07/2026
স্বাগতম "অপ্রকাশিত"-এ। 🌙
এখানে থাকবে না-বলা ভালোবাসা, অসমাপ্ত গল্প, অপেক্ষা আর বিচ্ছেদের অনুভূতি।
যদি কোনো গল্পে নিজের ছায়া খুঁজে পাও, তবে পাশে থেকো। 🤍
Click here to claim your Sponsored Listing.