Bare Stories
Where hearts speak
15/07/2026
যখন ভর দুপুরে তৃষ্ণা আর ক্লান্তিতে শরীর জুড়িয়ে আসে, বুকে হাহাকার ওঠে অকারণে, তখন ফিরে যাই ছোট বেলায়। ক্লান্তিহীন শৈশব আমার! আমার পুরো শৈশব কেটেছে আমার দাদা দাদীর সাথে, আমার আব্বা আম্মার চেয়েও আপনজন ছিলেন যারা। আমার দাদী কোথাও বেড়াতে গেলে অবশ্যই আমার সাথে যাওয়া চাই। মাঝেমধ্যে এমন হতো স্কুল বাদ দিয়ে আমি দাদীর সাথে চলে যেতাম। আব্বা যখনই মারমুখী হয়ে তেড়ে আসতেন, দাদী নানান ছলে আমাকে আড়াল করে নিতেন। আমার দাদী, আমার দাদু, আমি আর আমার ভাই ডাকতাম দাদু আর দিদি বলে। গ্রামের মানুষ হাসতো, টিটকারি দিতো। মোসলমান ঘরের কেউ দিদি ডাকেনা, দিদি ডাকে হিন্দুরা! আমি কাঁদতে কাঁদতে দাদু আর দিদিকে এসে বিচার দিতাম। দিদি হেসে বলতেন, ডাকের মধ্যে ধর্ম নেই। আমি চুপ মেরে যেতাম, জায়নামাজে বসা দিদি বাকি নামাজ শেষ করতেন। তারপর তসবি যপতেন, তারপর অনেক্ষণ সময় নিয়ে, প্রশান্ত মন নিয়ে দোয়া পড়তেন। ততক্ষণে আমার দাদু মসজিদ থেকে ফিরতেন। আর আমার ভিতরের রাগ ততক্ষণে উড়ে যেতো কর্পূরের মতন। আমার কাছে আমার দাদু দিদি সব ছিলো, সব মানে সব! এক পৃথিবী সমান! কিংবা বলা চলে আমার দাদু দিদির সমান ছিলো আমার পৃথিবী। মাঝরাতে ঘুম ভেংগে মনে হতো আমার হাতে মেহেদি দেওয়া দরকার। আমি জানিনা কেনো আমার এমন উদ্ভট খেয়াল হতো। রাত্তিরের অন্ধকার ছিড়ে হারিকেনের নিভুনিভু আলোর মতো চলতো আমার বিরক্তিকর আর ঘ্যানর ঘ্যানর কান্না। আমার ছোট ফুপু বিরক্ত হতেন, চুপ করাতে চাইতেন, আমার জেদ চেপে যেতো। তাহাজ্জুদ পড়তে ওঠে দাদু শুনতেন আমার কান্না। ফুপুকে ডেকে তুলে হারিকেনের আলো জ্বালিয়ে অন্ধকার ভেংগে গাছ থেকে তুলে আনা হতো মেহেন্দি পাতা। আমি ঢুলুঢুলু চোখে অপেক্ষা করতাম! মেহেন্দি বাটা শেষ হবে, আমার হাতের তালুতে দেওয়া হবে মেহেন্দি। মেহেন্দি পাতা সুগন্ধ আর ফযরের আগে আগে তাহাজ্জুদরত আমার দাদু দিদির দোয়ার আবহ, আমার মনে হতো এইটাই জগৎ, এটাই সত্য! ভোররাতে গাছ থেকে মেহেন্দি পাতা তুলে এনে বেটে হাতে লাগানোই যেন খুব সাধারণ ব্যাপার।
আমি বড় হতে থাকি সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে। পৃথিবী থেকে যাওয়ার সময় কমে আসতে থাকে আমাদের। আমাদের? নাকি শুধু আমার দাদু আর দিদির? নাকি আমার পুরা পৃথিবীর? আমার দাদু চলে যাওয়ার পরে কি অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকতেন আমার দিদি। কবে যাবেন প্রিয় মানুষটার কাছে! এতো আকুলতা! আমার দাদু দিদি কি নির্মল এক আবেগ দিয়ে আমাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ছিলেন! আমার দিদি যখন চলে গেলেন তখন আমার বয়স ১৫/১৬। অথচ এই মধ্য তিরিশে এসেও আমি অনুভব করি আমার দাদু দিদিকে, তাদের ভালোবাসা কে, তাদের নির্মল আবেগকে। আমিও কি কম অপেক্ষায়?
আমার দাদু দিদি ছিলেন হাজার হাজার বছর ধরে স্থির আর সমুন্নত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বট বৃক্ষের মতোন। ঠিক যে বটগাছ দাঁড়িয়ে আছে আমার দিদির বাবার বাড়ির সামনে। যতবার আমি দিদির সাথে তাঁর বাবার বাড়ি (বাবা মা মারা গেছেন আমার দিদি যখন কিশোরী) যেতাম, ততবারই দিদিকে জিজ্ঞেস করতাম সেই বটবৃক্ষের বয়স! আমার দিদি কখনো বিরক্ত হতেন না। প্রতিবারই একই উত্তর দিতেন, এই বট গাছ আমার বাবার আমল থেকে একই রকম আছে, আমার বাবা ও তার বাবার মুখে একই কথা শুনছেন। তার মানে এই বট গাছ শত শত বছর ধরে দাঁড়িয়ে। দিদি কি আবেগ দিয়ে তার বাপের বাড়ির সেই বটগাছের কাহিনী বলতেন! যখন একটু একটু করে বড় হচ্ছিলাম, তখন থেকে বুঝতাম আমার দিদি বটগাছকে সাক্ষী রেখে তাঁর বাবা মা, ভাই বোনের বা তাঁর বাড়ির স্মৃতি আকড়ে ছিলেন। বাল্য বিবাহ হয়ে যাওয়া এক বাচ্চা মেয়ের ১০ বছর বয়েসে বাড়ি ছাড়ার পরে বটগাছ ছাড়া আর কি ই বা সাক্ষ্য হয়ে থাকবে? বছরে ছয় মাসে এক বার বাপের বাড়ি গিয়েছে ঠিকই, আদৌ কি নিজের বাড়ি ছিলো? আমি কল্পনায় দেখি, আমার দিদি হয়তো বটগাছের কাছে তাঁর দুঃখ জমা রেখে আসতো। নয়তো একটা বটগাছের গল্প কেউ এতো আবেগ দিয়ে করে? এই মধ্য তিরিশে এসে আমিও দিদির মতোন একটা বটগাছ খুঁজি, যে গাছের গল্পের আড়ালে থাকে আমার শৈশব, আমার কৈশোর, আমার ফেলে আসা দিন, আমার দাদু দিদি, আম্মা আব্বা, আমার ভাই বোন কিংবা উঠানে লাগানো রংবেরং এর ফুলের গাছ। আমার আর ঘরে ফেরা হয়না। আমার বাড়ি থেকে কখন কবে বাপের বাড়ি হয়ে গেলো! আমার দিদি, আমার আম্মা, আমি, আমরা কি সেই বটগাছের মতোন? আমাদের ঘিরে থাকে সংসার, আমরা হয়ে থাকি একা দাঁড়িয়ে থাকা বটগাছ!
21/05/2026
২০১৮ সালে আমি প্রথম নিজের টাকায় একটি আইফোন ৬ কিনি। তখন দাম পড়েছিল প্রায় ৪৬–৪৮ হাজার টাকা। সদ্য গ্র্যাজুয়েট হিসেবে একটি মোটামুটি ভালো বেতনের চাকরির পাশাপাশি স্টুডেন্ট লাইফের তিনটি টিউশনিও চলছিল। আমার অফিস ছিল মহাখালী ডিওএইচএসে, আর আমরা থাকতাম বসুন্ধরা আবাসিকে। এই রুটের জ্যাম, বাসের ভোগান্তি—সব মিলিয়ে জীবন ছিল একেবারে ত্যানাত্যানা। এর মধ্যে নতুন ফোন কিনে রিকশা আর বাসে অফিসে যাতায়াত করাটা আব্বার কোনোভাবেই পছন্দ হচ্ছিল না। ঢাকার অমানবিক যানজট আর প্রতিদিনের নানান দুর্ঘটনার খবর শুনে এমনিতেই আব্বা চাইতেন না আমি চাকরিটা চালিয়ে যাই। তার ওপর ফোন কেনার পর থেকে তাঁর দুশ্চিন্তা যেন আরও বেড়ে গেল।
ফোন কেনার দ্বিতীয় দিন আব্বা আমাকে বললেন, “অফিসে যাওয়ার সময় ব্যাগ শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রাখবি না।”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন আব্বা?”
আব্বা বললেন, “যেন কেউ টান দিলে সহজে নিয়ে যেতে পারে। তুই যদি শক্ত করে ধরে থাকিস, তাহলে ব্যাগের সাথে তুইও পড়ে যাবি। ব্যাগ যাক, মোবাইল যাক—আমার সন্তান যেন সহিসালামতে ঘরে ফিরে।”
আমি তখন হেসে বলেছিলাম, “কি যে বলেন না আব্বা! আপনি শুধু অকারণেই বেশি চিন্তা করেন।”
বয়স বেড়েছে, হাতে এখন আরও নতুন ফোন, দেশ ছেড়ে বিদেশে বসবাস। কিন্তু আব্বা-আম্মার অনেক কথা, অনেক দুশ্চিন্তার ভেতর এই কথাটাই বারবার মাথায় ঘুরপাক খায়। আমরা এমন এক দেশে জন্মেছি, যেখানে সব হারিয়ে যাক—তবু সন্তান যেন নিরাপদে ঘরে ফিরে আসে, এই চিন্তায় প্রতিটি বাবা-মাকে দিন কাটাতে হয়। মেয়ে যেন সহিসালামতে ঘরে ফেরে—এই দোয়ায় হয়তো আমার বাবা-মায়ের মতো লাখো কোটি বাবা-মা মাগরিবের নামাজের পর আরও কিছুক্ষণ জায়নামাজে বসে থাকেন।
আমি এখনো বাবা-মাকে বলি, “আপনারা এত চিন্তা করেন কেন?”
তাঁদের একই উত্তর—
“যেদিন নিজে সন্তানের মা হবি, সেদিন বুঝবি।”
বাচ্চা না হওয়া নিয়ে আমার ভেতরে সবসময় এক ধরনের দমবন্ধ করা মনখারাপ কাজ করে। চারদিকে এত আনন্দ, জীবন এত সুন্দর, আল্লাহর দেওয়া অফুরন্ত নিয়ামতের মাঝেও কোথাও যেন এক গভীর শূন্যতা। অবুঝ মন কতভাবে নিজেকে বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করে! তখন বাবা-মায়ের কথাই ভাবি—আমরা ঘরের বাইরে থাকলে কিংবা ফিরতে দেরি হলে তাঁদের যে অস্থিরতা, বারবার ফোন করে নিশ্চিন্ত হওয়ার চেষ্টা—কত বড় এক মানসিক ভারই না আমরা তাঁদের কাঁধে তুলে দিয়েছি।
আমি ভাবি সেইসব বাবা-মায়ের কথা, যাদের সন্তান হাসিমুখে ঘর থেকে বের হয়ে আর কোনোদিন ফিরে আসেনি। তাঁরা কেমন করে বেঁচে থাকেন?
ইয়া মাবুদ, পৃথিবীর সব বাবা-মাকে ভালো রেখো। তাঁদের সন্তান যেন সহিসালামতে ঘরে ফিরে আসে।
আমি ভাবি তনুর কথা। ভাবি রামিশার কথা, শাজনীনের কথা, নিসার কথা, আব্দুল্লাহর কথা—আরও কত শত নাম! কিন্তু আমি নিজেকে তাঁদের বাবা-মায়ের জায়গায় কল্পনাও করতে পারি না। পারি না ভাবতে। তখন শুধু মনে হয়, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী। হয়তো আমি এমন কঠিন জীবনের ভার বহন করতে পারব না বলেই তিনি আমাকে নিঃসন্তান রেখেছেন। কারণ হাজার চেষ্টা করেও আমি নিজেকে ওই বাবা-মায়ের জায়গায় দাঁড় করাতে পারি না।
আমার বুক ভার হয়ে আসে।
আমাদের বিচারব্যবস্থায় যারা আছেন, দেশ পরিচালনার দায়িত্বে যারা বসে আছেন—তাঁদেরও তো সন্তান আছে। আপনারা একবার মানুষ হয়ে দেখুন, একটু মানবিক হোন। এই বাবা-মায়ের জায়গায় নিজেকে দাঁড় করানোর সাহস করুন। পারবেন? নাকি সন্তান নিজের না হলে টনক নড়ে না? কতটা অসহায় হলে রামিশার বাবা বিচার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন! বিচারব্যবস্থার ওপর কতটা আস্থাহীন হলে এমন কথা এত সহজে বলা যায়!
আমরা সাধারণ মানুষ বারবার লজ্জিত হই। ভিক্টিমের নাম বদলায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় ওঠে, আমরা জাতি হিসেবে লজ্জা পাই। কিছু শুয়োরের বাচ্চা এসে আবার বিকৃত রুচির পরিচয় দেয়, আর আমরা ঘৃণায় থুতু ফেলি এসব জারজদের উদ্দেশ্যে। তারপর আবার ভুলে যাই, আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাই। ফিরতেই হয়। কারণ নিজেদের জীবন নিজেদেরই সামলাতে হয়; রাষ্ট্র আমাদের ভাষা বোঝে না।
রাষ্ট্রের মাথায় যারা বসে আছে, তারা যেন একেকটা কাক—দেখেও দেখে না, শুনেও শোনে না, বুঝেও বোঝে না। কারণ তাদের লক্ষ্য ভিন্ন, তাদের ক্ষুধা অসীম। কারণ তারা এক একটা তলাবিহীন ঝুড়ি!
28/04/2026
Afsar Brothers থেকে প্রকাশিত Sober- এর “লয় ভাগছে” বইটি অনেক কষ্টে সংগ্রহ করেছি। মূলত সোবারের হিউমারাস পোস্টের আমি ভীষণ ভক্ত, সেই তাগিদেই বইটি নেওয়া।
ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি, স্মার্টফোন আমাদের ধৈর্য অনেক কমিয়ে দিয়েছে। আঙুলের ডগায় একের পর এক রিলস দেখতে দেখতে বই পড়ার ধৈর্য যখন প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে, তখন সোবারের “লয় ভাগছে” বইটি টানটান উত্তেজনা আর ভয়ের মধ্যে আমাকে শেষ না হওয়া পর্যন্ত আটকে রেখেছে। অনেক দিন পর একটানে পুরো একটা বই শেষ করে একটু আফসোসই হচ্ছিল—যদি আরো কটা গল্প থাকতো!
প্রথম গল্প “অতিথি”, তারপর “চাচা কাহিনি”, “তাবিজ”, “আম্মু”—এই চারটি গল্পের সঙ্গে আমার জীবনের কিছু ঘটনার অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছি বলেই এই লেখা। আজকের গল্পটা “তাবিজ” গল্পের ছায়া অবলম্বনে আমার নিজের জীবনের একটি ঘটনা শেয়ার করতেছি।
আমি তখন ব্যাচেলরে পড়ি, ফাইনাল ইয়ার। থাকতাম বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সি ব্লকে (রোড বা বাসা নম্বর উল্লেখ করছি না)। চার বেডরুমের একটি ফ্ল্যাটে আমরা চারজন ছাত্রী থাকতাম। পুরো বিল্ডিংয়ে আমরা ছাড়া বাকিরা সবাই ফ্যামিলি। বাড়িওয়ালা আঙ্কেলও বেশ ভদ্রলোক ছিলেন, তাই সব মিলিয়ে বাসাটা আমাদের কাছে নিরাপদই মনে হয়েছিল।
আমাদের একজনের বাসা একটু দূরে হওয়ায় সে শুধু পরীক্ষার সময় কিংবা মাসে এক দুইদিন এসে থাকত, বাকি সময় আমরা তিনজনই থাকতাম। আমার অভ্যাস ছিল মাগরিবের আজানের আগেই বাসায় ফেরা। অন্য দু’জন ক্লাস শেষে ৩০০ ফিটে আড্ডা দিয়ে রাত ৯-১০টার দিকে ফিরত। তখন (২০১৫/১৬ সালের দিকে) ৩০০ ফিট মানেই ছিল স্টুডেন্টদের জমজমাট আড্ডার জায়গা।
বাসায় একা থাকলে প্রায়ই মনে হতো, আমি একা নই—আরও কেউ আছে। প্রথমে গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু ধীরে ধীরে খেয়াল করলাম, যেন কেউ হাঁটাচলা করছে। আমি রুম থেকে বের হলেই মনে হতো কেউ দৌড়ে সামনের রুমে ঢুকে যাচ্ছে (যে ফ্ল্যাটমেট মাঝে মাঝে থাকত, তার রুম)। ছোটবেলা থেকেই কিছু প্যারানরমাল অভিজ্ঞতা থাকায় ব্যাপারগুলো পুরোপুরি অচেনা ছিল না, তবুও অস্বস্তি বাড়ছিল। তবে সবাই একসাথে থাকলে সব স্বাভাবিক থাকত।
একদিন মাঝরাতে প্রচণ্ড তৃষ্ণায় ঘুম ভেঙে যায়। পানি খেতে ডাইনিংয়ে যাওয়ার জন্য দরজা খুলতেই দেখি—একটা ছোট মেয়ে! বছর চারেক হবে বয়স। গোলাপি ফ্রক পরা। প্রথমে মনে হচ্ছিল স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু হুঁশ ফিরতেই গলা দিয়ে শুধু গোঙানির মতো শব্দ বের হচ্ছিল। চিৎকার করে কাউকে ডাকব—সেই শক্তি বা বোধ, কোনোটাই কাজ করছিল না।
পরদিন পাশের রুমে থাকা আমার বান্ধবীকে সব বললাম। সে শুনে বলল, “তোর সাথে কিছু আছে বলেই তুই এসব দেখছিস। আমাদের এসব বলিস না।” অনেক কষ্টে ভালো একটা বাসা পেয়েছি—এটা ছেড়ে দেওয়া সম্ভব না, ঠিকমতো নামাজ দোয়া পড়।কথাগুলো শুনে আমি চুপ হয়ে গেলাম। কারণ আগের বাসাটাও কিছু ঘটনার কারণে আমার জোরাজুরিতেই ছেড়েছিলাম।
এরপর থেকে মাঝেমধ্যে সেই গোলাপি ফ্রক পরা মেয়েটাকে দেখতে শুরু করলাম, বেশিরভাগই গভীর রাতে। দিনের বেলা কখনো না।
সেমিস্টার ফাইনালের পর আমার বান্ধবী বাসায় চলে যায়। আমার ইন্টার্নশিপ খোঁজা আর একটি কোর্সের ফাইনাল বাকি থাকায় আমি থেকে যাই। সাথে ছিল অন্যরুমে থাকা জুনিয়র এক মেয়ে—ধরি তার নাম সায়মা। তাকে আমি এসব কিছু বলিনি।
প্রায় প্রতিদিনই রাত ৯-১০টা পর্যন্ত বাসায় একা থাকতাম। আর রাত হলেই শুরু হতো অদ্ভুত সব ঘটনা—কখনো দেখি বাচ্চা মেয়েটা রুম থেকে ব্যালকনির দিকে যাচ্ছে। দিন দিন মানসিক অবস্থা খারাপ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, কোনোভাবে পরীক্ষা শেষ করে বাসায় চলে যাই। এসবকিছু আব্বা আম্মাকে বলতেও ইচ্ছা করছিলো না। আব্বা আম্মা জানলে আম্মা চলে আসবে আমার কাছে, আমার অন্যান্য ছোট ভাইবোনরা অসুবিধায় পরে যাবে, সবকিছু মিলায় মনে হচ্ছিলো কোনরকমে পরীক্ষাটা শেষ করতে পারলেই হলো, মাত্র কটা দিনেরই তো ব্যাপার। এর মধ্যে একদিন সন্ধ্যা ৭-৮ টার দিকে গোসল করে বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখি রুম থেকে একটা ছায়ার মতোন কিছু ব্যালকনিতে চলে যাচ্ছে (আমার রুমের সাথে এটাচড ব্যালকনি)। কোনরকমে জামা কাপড় গায়ে দিয়ে দৌড়ে বের হয়ে গেলাম বাসা থেকে। সেদিন আমার জুনিয়র সায়মা গেছিলো নিউমার্কেটে, ফিরতে দেরি হচ্ছে, জ্যামে আটকা পড়ে আছে। সে ফিরে না আসা পর্যন্ত আমি বসুন্ধরা গেইটে পপাইস এ বসে ছিলাম।
সেই রাতে বাসায় ফিরার পরে আমার উতাল পাতাল জ্বর এলো। জ্বরের ঘোরে অদ্ভুত সব হ্যালুসিনেশন হচ্ছিল—কখনো মনে হচ্ছিল বিশাল মাঠে শুয়ে আছি, কখনো মনে হচ্ছিল অনেক মানুষ আমাকে ঘিরে বসে আছে। আমি নাকি প্রলাপ বকছিলাম—পরে সায়মার মুখে শুনেছি।
জ্বর বেশি দেখে সায়মা মাথায় পানি দেয়, জলপট্টি দেয়। এরপর আমি গভীর ঘুমে চলে যাই। হঠাৎ ঘুমের মধ্যে মনে হলো—আমার বালিশটা চেক করা উচিত। এটা ঠিক বোঝাতে পারছি না—মনে হচ্ছিল কেউ যেন আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে।
হঠাৎ জেগে উঠে বালিশের কাভার খুললাম। অনেকক্ষণ ধরে চেপে চেপে দেখার পর বুঝলাম, ভেতরে শক্ত কিছু আছে। ড্রয়ার থেকে কাঁচি এনে বালিশ কেটে দেখি—ভেতরে একটা তাবিজ! ছোট ধাতব চারকোনা তাবিজ।
তাবিজটা হাতে নেওয়ার পর অদ্ভুতভাবে শরীর হালকা লাগছিল। অথচ বালিশটা আমি নিজেই নতুন বাজারের একটি দোকান থেকে কিনেছিলাম। এতদিন ব্যবহার করেও কখনো বুঝিনি ভেতরে কিছু আছে! কোন দোকানদারই বা ভেতরে তাবিজ দিয়ে তারপর সেলাই করে কেনো বালিশ বিক্রি করবে!
পরদিনই দারোয়ান মামাকে দিয়ে তাবিজটা অন্য কাগজের সঙ্গে পুড়িয়ে ফেলি। আর সেদিনই ফাইনাল পরীক্ষা না দিয়ে বাসায় চলে যাই। পরে অবশ্য কোর্সটি রিটেক নিতে হয়েছিল।
মজার ব্যাপার হলো—সেদিনের পর থেকে আজ পর্যন্ত সেই বাচ্চা মেয়েটাকে আর কখনো দেখিনি।
এমন আরও অনেক ঘটনা আছে, এটি তার মধ্যে একটি। তাবিজ ঘটনার রেশটা বছরখানেক আগে আবারো জীবনে ফিরে এসেছিল—সেটা অন্য কোনো সময় বলব।
ফুটনোটঃ আমি আগে কখনো গল্প লিখিনি, এমনকি ফেসবুকে এত বড় পোস্টও দিইনি। ভাষাগত ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন😇
26/04/2026
বাসে করে যাচ্ছি এক জুনিয়রের বাসায়, চা এর আড্ডার দাওয়াত। এই বিদেশবাড়িতে দেশি মানুষের সাহচর্য পাওয়া, সুসম্পর্ক থাকা অনেক বড় পাওয়া।
আমার সামনের পাশাপাশি ৮টা সিটে (মাঝ বরাবর পাশাপাশি ৮টা সিট থাকে) ৮জন স্টুডেন্ট বসা, দেখে বুঝা যাচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন দেশের। হয়তো মাস্টার্স লেভেলেরই হবে। সবারই খুব প্রাণ খোলা গল্প, গেইমস, টেকনোলজি, ক্যারিয়ার। বাস ইউনিভার্সিটির সামনে আসতেই সবাই হুড়মুড়িয়ে নেমে গেলো বাস ড্রাইভারকে ধন্যবাদ দিয়ে।
ওরা ৮জন নেমে যাওয়ার পরে তাদের সিটে আসলো কম বয়েসী ৬টা মেয়ে, হাইস্কুল বা বড়জোর কলেজের হবে। ওদের গল্পের ধরণ আবার আলাদা, অল্প বয়েসী কিশোরী, অকারণে হেসে একজন আরেকজনের উপর ঢলে পরছে। আবার চলছে কানে কানে ফিস ফিস। পৃথিবীর সব দেশে, সব জাতি, সব সংস্কৃতিতে কি এই কৈশোর আর তারুণ্য একই? মন খোলে হাসা, অকারণে একে অপরের উপর হেসে লুটিয়ে পরা!
এই বয়েসী ছেলেমেয়ে দেখলে এতো ভালো লাগে! একটু খানি সময়ের জন্য যাবতীয় দায় দায়িত্ব থেকে যেন মুক্তি মেলে। তিরিশের কাটা পার হওয়ার পরে জীবন এতো কঠিন হবে কে জানতো!
আমি যখন ইউনিভার্সিটিতে ব্যাচেলর এ ছিলাম, ছুটির দিন কিংবা উৎসবের দিনগুলোতে বাসায় আরামে ঘুমিয়ে কাটাতে পছন্দ করতাম। আম্মা তখন বার বার বলতেন, একটু ঘুরে আয় বন্ধু বান্ধবদের সাথে, এই সময় আর পাবিনা। যখন বড় হবি, সংসার হবে, দায়িত্ব বাড়বে, এরকম নিশ্চিত মনে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ না ও থাকতে পারে।
জীবন যেন ঠিক এই যাত্রী ভরা বাসের মতোন। নির্দিষ্ট গন্তব্য আসলে নেমে পড়তে হয়, সিট আবার পূরণ করে অন্য কেউ!
কানে বেজে চলছে তালাত মাহমুদের গান - “মুঝে এক জায়গা আরাম নেহি, রুখ জানা মেরে কাম নেহি, মেরে সাথ কাহাতাক দোউগী তুম, ম্যায় দেশ বিদেশ কা বাঞ্জারা।"
20/04/2026
আগ বাড়িয়ে কাউকে উপদেশ দিতে নেই, বিশেষ করে উঠতি বয়সী পোলাপানদেরকে। সবাই ভুল করে, জীবনে বার বার হোঁচট খায়, তারপর ঘুরে দাঁড়ায়। এক আধজন হয়তো মুচড়ে পরে।
দিনশেষে সবাই মারা খেয়ে শিখে।
30/01/2026
সময় ফুরিয়ে যায়।
আমাদের অপূর্ণ প্রাপ্তি, আমাদের না-পাওয়া,
আমাদের অতীতের ছায়া,
অক্ষমতা আর অপারগতার ভার—
সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে আমাদেরই গ্রাস করে।
একটি জীবনের পরিসর এতটুকু,
তবু কত অজানা, কত অধরা স্বপ্ন
অকথিত থেকে যায়—
সময়ের ওপারে, স্মৃতির আড়ালে।
29/01/2026
Some girls be like- আমি ডালভাত সব খেয়েই ওজন কমিয়েছি।
আর এদিকে আমি ভাতের দিকে জাস্ট একবার তাকাইলেও ১/২ কেজি ওজন বেড়ে যাচ্ছে!
Dear Lucky girls/women, what’s your secret?
সম্ভবত ২০০৫ কিংবা ২০০৬ সালের কথা। আম্মা, ভাইবোন আর নানাবাড়ির কয়েকজন মিলে সেন্টমার্টিন ঘুরতে গিয়েছিলাম। তখনকার সেন্টমার্টিন আজকের মতো আধুনিক বা ঝলমলে ছিল না—ফেসবুকে যে রিসোর্ট, ক্যাফে আর আলোঝলমল ছবিগুলো দেখি, সেসবের কিছুই তখন ছিল না। সেটাই ছিল আমার প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র সেন্টমার্টিন ভ্রমণ।
আমরা উঠেছিলাম একটা জায়গায়—নামে রিসোর্ট হলেও আদতে সেটা লজের মতোই ছিল। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে শান্তির ভাতঘুম দিয়েছিলাম। ঘুম ভাঙতে ভাঙতেই মনে হলো পুরো দ্বীপে যেন হঠাৎ রাত নেমে এসেছে।
রাতের সমুদ্র দেখার ইচ্ছে হলো। যদিও রিসোর্ট থেকেই সমুদ্র দেখা যেত, তবু বাইরে বের হলাম। তখনো আমার জানা ছিল না যে ভাটার কারণে রাতে সমুদ্রের পানি অনেকটা নিচে নেমে যায়। চারপাশে স্বচ্ছ, মেঘমুক্ত আকাশ—নিস্তব্ধ সমুদ্র—এক অদ্ভুত শান্তি।
আর ঠিক তখনই আমার ভেতরে অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করতে শুরু করল।
আকাশ এত সুন্দর কেন?
সমুদ্র এত বিশাল আর নিঃশব্দ কেন?
মনে হচ্ছিল, এই সৌন্দর্য আমি নিতে পারছি না। যেন কিছু একটা আমাকে গ্রাস করে ফেলছে। বুকের ভেতর অজানা ভয় জমতে লাগল। আমি বুঝতেই পারছিলাম না কেন, অথচ মায়ের হাত শক্ত করে ধরে কাঁদতে শুরু করলাম। চারপাশে সবাই আনন্দ করছিল, হাসছিল, উপভোগ করছিল রাতের সমুদ্র। আর আমি—আমি শুধু কাঁদছিলাম। একদম হাবার মতো।
বহু বছর পরে, ঠিক একই রকম অনুভূতির মুখোমুখি আমি আবার হলাম।
জীবন আমাকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে বাসা থেকে দু’কদম হাঁটলেই বরফে জমে থাকা লেকের ধারে দাঁড়িয়ে আকাশে অরোরা দেখা যায়। গত তিন বছরে আমি বহুবার অরোরা দেখেছি। কিন্তু শেষবারের অরোরাটা ছিল ভিন্ন।
আলোর তীব্রতা ছিল অসাধারণ। সবুজ, বেগুনি, নীল—একাধিক রঙের অদ্ভুত এক নাচে যেন পুরো আকাশ নিজের সমস্ত ক্যারিশ্মা উজাড় করে দিচ্ছিল। আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেই আলো-ছায়ার ভেতরে।
আর তখনই ফিরে এলো সেই বহু পুরোনো পরিচিত ভয়।
মনে হচ্ছিল, এই অপার্থিব সৌন্দর্যও আমি নিতে পারছি না। বুক ভরে আসছিল। অজান্তেই চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। তবে এবার মায়ের হাত নয়—আমি ধরে ছিলাম স্বামীর হাত। বেচারা হতভম্ব হয়ে চেষ্টা করছিল বোঝার—অরোরা দেখে ভয় পেয়ে কাঁদার কী আছে!
পরে কৌতূহল থেকে খুঁজে দেখলাম—এমন অভিজ্ঞতাকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।
কেউ একে বলেন ‘’Existential fear’’ অস্তিত্ব নিয়ে হঠাৎ গভীর শঙ্কা।
কেউ বলেন “Cosmic anxiety” মহাবিশ্বের বিশালতা মানুষকে হঠাৎ খুব ছোট করে দেয় বলে যে ভয়।
আবার দার্শনিকভাবে একে বলা হয় “The Sublime” এমন এক সৌন্দর্য, যা একসঙ্গে মুগ্ধ করে আবার ভয়ও জাগায়।
মানুষের ফোবিয়ার যে কত রকম রূপ আছে! অথচ অপার্থিব সৌন্দর্য নিয়ে মানুষ বরাবরই কাব্যিক। চাঁদ, তারা, আকাশ, অরোরা—সবাই মুগ্ধ হয়, প্রেমে পড়ে।
আর আমার মতো হয়তো গুটিকয়েক মানুষ আছে—
যারা রাতের আকাশে বড় পূর্ণিমার চাঁদ দেখলে ভয় পায়,
মেঘমুক্ত আকাশে চাঁদ আর তারার সখ্যতা সহ্য করতে পারে না,
আর যে অরোরার এক ঝলক দেখার জন্য গোটা পৃথিবী পাগল—
তার তীব্রতায় ভেসে যাওয়ার বদলে,
আমি বোকার মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেলি।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Website
Address
Dhaka
1229