abdus samad
amusement
হাদীসের আলোকে শবে বরাত - ফযীলত, করণীয় ও বর্জনীয়
লেখক: 'মুসলিম বাংলা' সম্পাদকীয়
শবে বরাত নামটির শাব্দিক বিশ্লেষণ
শবে বরাত নামটি একটি ফার্সি ও একটি আরবী শব্দের সমন্বয়ে গঠিত।
"শব" শব্দটি ফার্সি, অর্থ রাত আর "বরাআত" শব্দটি আরবী, অর্থ মুক্তি। দুটি মিলে অর্থ হয় "মুক্তির রাত"। যেহেতু এ রাতে অগণিত মানুষের গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয় এবং বহু জাহান্নামিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়া হয়, তাই এ রাতটি "শবে বরাত" বা মুক্তির রাত নামে পরিচিত। হাদীস শরীফে এ রাতটি "লাইলাতুন নিসফ মিন শাবান" (অর্ধ শাবানের রাত তথা ১৪ শাবান দিবাগত রাত) বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শবে বরাতের ফযীলত সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কয়েকটি হাদীস
১ম হাদীস
عن معاذِ بنِ جبلٍ ٬ عنِ النَّبيِّ صلّى اللَّهُ عليهِ وسلَّمَ ٬ قالَ : يطَّلِعُ اللهُ إلى خَلقِه في ليلةِ النِّصفِ مِن شعبانَ فيغفِرُ لجميعِ خَلْقِه إلّا لِمُشركٍ أو مُشاحِنٍ
অর্থ: হযরত মু'আজ ইবনে জাবাল রাদি. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা অর্ধ শা'বানের রাতে [শবে বরাতে] তাঁর সৃষ্টির প্রতি মনযোগী হন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তি ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।
সূত্র: সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস : ৫৬৬৫; সুনানে ইবনে মাজাহ্, হা: ১৩৯০; আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব, হা: ১৫৫২; মুসান্নাফু ইবনে আবী শাইবাহ, হা: ৩০৪৭৯; ওয়াবুল ঈমান, হা: ৬২০৪
২য় হাদীস
عن عليِّ بنِ أبي طالبٍ رضي اللَّهُ عنهُ قالَ: قالَ رسولُ اللهِ صلّى اللهُ عليه وسلَّمَ إذا كانت ليلةُ النِّصفِ من شعبانَ فقوموا ليلَها، وصوموا نَهارَها، فإنَّ اللَّهَ يَنزِلُ فيها لغُروبِ الشَّمسِ إلى سماءِ الدُّنيا، فيقولُ: ألا من مُستغفِرٍ لي فأغفرَ لَه ! ألا مُسترزِقٌ فأرزقَهُ ألا مُبتلًى فأعافيَهُ ألا كذا ألا كذا حتّى يطلُعَ الفجرُ
অর্থ : হযরত আলী রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, অর্ধ শা'বানের রাত [১৪ শা'বান দিবাগত রাত] যখন আসে তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত বন্দেগীতে কাটাও এবং দিনের বেলায় রোযা রাখ। নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা এ রাতে সূর্যাস্তের পর প্রথম আসমানে আসেন এবং বলতে থাকেন, আছে কি কোনো ক্ষমাপ্রার্থী? আমি তাকে ক্ষমা করবো। আছে কি কোনো রিযিক প্রার্থী, আমি তাকে রিযিক দিব। আছে কি কোনো বিপদগ্রস্ত, আমি তাকে বিপদমুক্ত করে দিবো। আছে কি এমন আছে কি এমন, এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত বলতে থাকেন।
সূত্র: সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং: ২৩৮৪; আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব, হাদীস নং: ১৫৫৬; শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং: ৩৮২২;
৩য় হাদীস
হযরত আ'লা ইবনুল হারিস্ রহ. থেকে বর্ণিত, উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা রাদি. বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে নামাযে দাঁড়ালেন এবং এত দীর্ঘ সিজদা করলেন যে, আমার আশঙ্কা হলো তাঁর হয়তো ইন্তেকাল হয়ে গেছে।
আমি তখন উঠে তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম। তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল। যখন তিনি সিজদা থেকে উঠলেন এবং নামায শেষ করে বললেন, হে আয়েশা! অথবা বললেন, ওহে হুমায়রা! তোমার কি এই আশঙ্কা হয়েছে যে, আল্লাহর রসূল সা. তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি উত্তরে বললাম, না, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার দীর্ঘ সিজদা থেকে আমার আশঙ্কা হয়েছিল আপনি ইন্তেকাল করেছেন কি না। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি জান এটা কোন্ রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি তখন বললেন,
هذهِ ليلةُ النِّصفِ من شَعبانَ، إنَّ اللهَّ عزَّ وجلَّ يَطَّلعُ على عِبادِه في ليلَةِ النِّصفِ مِن شَعبانَ، فيغفرُ للمستَغفرينَ، ويرحمُ المستَرحمينَ، ويُؤَخِّرُ أهلَ الحِقدِ كما هُمْ
এটা হল অর্ধ শা'বাননের রাত। (শা'বাননের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত)। আল্লাহ তা'আলা অর্ধ শা'বাননের রাতে তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন, ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহপ্রার্থীদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই।
সূত্র: শুআবুল ঈমান, বায়হাকী ৩/৩৮২-৩৮৩
এ রাতে করণীয় আমলসমূহ
উল্লেখিত হাদীসসমূহ থেকে প্রতিয়মান হয় যে, এ রাতে ইবাদতের কোনো ধরণ নির্দিষ্ট নেই বরং এ রাতে এমন সব নেক আমল করা উচিৎ যার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত লাভ করা যায়। তাই এ রাতে আমরা নিম্মোক্ত আমলসমূহ করতে পারি।
এক. মাগরিব, এশা ফজরের নামায অবশ্যই জামাতের সাথে আদায় করা।
দুই.নফল নামাজ পড়া।এক্ষেত্রে অনির্ভরযোগ্য কিছু বই-পুস্তকে নফল ইবাদতের বিভিন্ন নিয়মের কথা লেখা আছে যেমন- এত রাক'আত পড়তে হবে, প্রতি রাক'আতে এই এই সূরা এতবার পড়তে হবে। অথচ সহীহ হাদীস শরীফে শবে বরাত, শবে কদর বা অন্য কোনো ফযীলতপূর্ণ রাতে এসব বিশেষ পদ্ধতির কোনো নামায প্রমাণিত নেই।
তিন. তওবা করা। তওবা বলা হয় [ক] কৃতপাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া [খ] সঙ্গে সঙ্গে এই পাপটি পরিহার করা [গ] ভবিষ্যতে এই পাপটি আর করবো না এই মর্মে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা [ঘ] বান্দার হক নষ্ট করে থাকলে তার হক আদায় করে কিংবা ক্ষমা গ্রহণ করে দায়মুক্ত হওয়া (ঙ) কোনো ফরয-ওয়াজিব ছুটে গিয়ে থাকলে মাসআলা অনুযায়ী তার কাযা কাফফারা আদায় করা। অতঃপর আল্লাহর আনুগত্যের দিকে ফিরে আসা এবং অন্তর থেকে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
চার. কুরআনে কারীম তেলাওয়াত করা, দুরূদ শরীফ পড়া, যিকির-আযকার করা ও ইস্তেগফার পড়া ইত্যাদি।
ফযীলতপূর্ণ দু'টি ইস্তিগফার
১. সায়্যিদুল ইস্তিগফার
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ خَلَقْتَنِي ، وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَبُوءُ لَكَ بِالنِّعْمَةِ وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي ، فَاغْفِرْ لِي إِنَّهُ لاَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلاَّ أَنْتَ
ফযীলত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি নিষ্ঠা ও বিশ্বাসের সাথে দিনে ও রাতে এই ইস্তিগফার পড়বে এবং এ অবস্থায় যে কোনো সময় মারা যাবে, সে নিঃসন্দেহে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৬৩০৬; সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ৩৩৯৩
২. সংক্ষিপ্ত ইস্তেগফার
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الْعَظِيمَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ، وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
ফযীলত : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি বিছানায় যাওয়ার পূর্বে এ ইস্তিগফার তিনবার পড়বে, আল্লাহ তা'আলা তার গুনাহ মাফ করে দিবেন। যদিও তা সুমুদ্রের ফেনা পরিমাণ হয় বা গাছের পাতার মতো অগণিত হয় অথবা 'আলেজের' মরুও বালুকারাশির সমপরিমাণ হয় কিংবা দুনিয়ার যত দিবসসমূহের সমপরিমাণ হয়।
সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং: ৩৫৭৭; আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব, হাদীস নং: ৬৮৯
পাঁচ. এ রাতে গুরুত্বসহকারে দু'আ করা, কারণ এ রাতে দু'আ কবুল হওয়ার কথা বার বার ধ্বনিত হয়েছে।
ছয়. এ রাতে কিছু দান সদকা করে এবং নফল ইবাদত করে মৃতদের জন্যে সাওয়াব পৌঁছানো।
সাত. ১৫ শা'বান নফল রোযা রাখা। রোযা রাখার বিষয়টি উল্লিখিত হাদীস ছাড়াও অন্যান্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
আট. সলাতুত তাসবীহ্ আদায় করা যেতে পারে। সালাতুত তাসবীহের নিয়ম কোনো আলেম থেকে জেনে নিতে হবে।
এ রাতের নফল আমলসমূহ সম্মিলিত নয়, ব্যক্তিগত
আল্লাহ তা'আলার সাথে একান্ত হয়ে একাকি সম্পর্ক গড়ার অন্যতম মাধ্যম হলো নফল ইবাদত। আর বিশুদ্ধ মতানুসারে নফল ইবাদত দলবদ্ধভাবে জামাতের সাথে নয় বরং একাকী করাই উত্তম। ফরয নামায তো অবশ্যই মসজিদে জামাতের সঙ্গে আদায় করতে হবে। এরপর যা কিছু নফল পড়ার তা নিজ নিজ ঘরে একাকী পড়বে এবং এটিই উত্তম পন্থা। কারণ ঘরকে ইবাদত শূন্য করা নিষেধ। সুতরাং বর্তমানে শবে বরাত, শবে কদরকে কেন্দ্র করে যে প্রচলন দেখা যাচ্ছে যে, এই রাতে নফল ইবাদতের জন্য লোকজন দলে দলে মসজিদে এসে সমবেত হয়, কোথাও মিলাদ হয়, কোথাও এক সঙ্গে বসে জোরে জোরে যিকির হয়, যার দরুণ একাকি ইবাদতকারীর ইবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।
অথচ এ রাতে এগুলো করার কোনো প্রমাণ হাদীস শরীফেও নেই এবং সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও তাবয়ে তাবেঈনের যুগেও এর কোনো প্রচলন ছিল না। তবে যদি বাসায় অলসতার দরুণ ইবাদত না হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেক্ষেত্রে মসজিদে এসে ইবাদত করতে দোষ নেই। এক্ষেত্রে প্রত্যেকে নিজ নিজ আমলে মশগুল থাকবে, একে অন্যের আমলে ব্যাঘাত সৃষ্টির কারণ হবে না।
ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকীম ২/৬৩১-৬৪১; মারাকিল ফালাহ পৃ: ২১৯
এ রাতেও যারা বঞ্চিত থেকে যায়
হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী কিছু লোক এমন রয়েছে যারা এই সাধারণ ক্ষমার রাতেও ক্ষমা পায় না। যতক্ষণ না তাওবা করে ফিরে আসে। হাদীসের আলোকে এরা হলো-
১. আল্লাহ তা'আলার সাথে অংশীদার স্থাপনকারী মুশরিক।
২. হিংসুক।
৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী।
৪. যে পুরুষ টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে পরতে অভ্যস্ত।
৫. পিতা-মাতার অবাধ্য সন্ধান।
৬. মদ্যপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি।
৭. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যাকারী।
দেখুন সহীহ ইবনে হিব্বান, হা: ৫৬৬৫ মুসনাদে আহমাদ, স্থানীয়। ৬৬৪২) যা বিস সুন্নাহ, পৃঃ ৩৫৫, ওয়াবুল ঈমান, ৩/৩৮৩-৩৮৫
শবে বরাতে বর্জনীয় বিষয়
শয়তান মানুষকে এই রাতে নেক আমল থেকে বিরত রাখার জন্য কিছু কুসংস্কারের প্রচলন ঘটিয়েছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো কিছু মানুষ এগুলোকে নেক কাজ মনে করে শুধু বিভ্রান্তই হচ্ছে। এ জাতীয় কিছু কুসংস্কারমূলক কাজ হলো-
১. আতশবাজী, পটকা ইত্যাদি ফুটানো ও তারাবাতি জ্বালানো।
২. মসজিদ, ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট ও অন্যান্য জায়গায় আলোকসজ্জা করা। এসব অপচয়ের শামিল। তাছাড়া এটি বিধর্মী এবং হিন্দু দেওয়ালী উৎসবের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার কারণে অবশ্যই পরিত্যাজ্য ও বর্জনীয়। হাদীস শরীফে এসেছে- "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্য রাখবে, সে তাদের দলভুক্ত হবে।"
সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং: ৪০৩১
৩. হালুয়া-রুটি, খিচুরী পাকানো। এ সবকে এ রাতের বিশেষ কাজ মনে করা হয়। মা-বোনদের দামি সময় নষ্ট হয়, মসজিদে হৈ চৈ ও শোরগোল হয়। ইবাদত করার পরিবেশ নষ্ট হয় এবং এ সবের পিছনে পড়ে এ রাতের তাওবা-ইত্তেগফার, নফল ইবাদত ইত্যাদি ছুটে যায়।
ইকতিষাউস সিরাতিল মুস্তাকীম, ২/৬৩২; আলূমাদখাল লি ইবনিল হাজ্জ, ১/২৯৯ ও১/৩০৬; ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৫/২৮৯
সুতরাং এগুলোও পরিহার করা আবশ্যক। এক কথায় এ রাতে আনুষ্ঠানিকতা এবং অপ্রয়োজনীয় কাজ বর্জন করে নিবিড়ভাবে নফল ইবাদতে আত্মনিয়োগ করা উচিৎ, যাতে আমরা বরকতপূর্ণ রাতের বরকত লাভে ধন্য হয়ে আল্লাহর সাধারণ ক্ষমাপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে এ রাতের যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করে একাগ্রতার সাথে তাঁর ইবাদত করার তৌফিক দান করুন। আমীন।
28/01/2026
Tofu is a best delicious food.just eating imagine so tasty🤪
বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এবং ঈমান-আমল
[জিনিস চেনার নাম বিজ্ঞান। জিনিস কে চিনে তা থেকে ফায়দা নেওয়ার মাধ্যম প্রযুক্তি। আল্লাহতালা প্রতি মুহূর্তে বিভিন্ন হালত বা অবস্থা দেন। হালাতের মধ্যে আল্লাহর হুকুম চেনার নাম ঈমান। নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে হালত থেকে আল্লাহর হুকুম নবীর তরিকায় পুরা করে ফায়দা নেয়ার নাম আমাল]
মানুষ মাত্রেই হয়েছে, সে বিভিন্নভাবে অন্যের সাহায্য পায়। আল্লাহ তাআলা তাকে এভাবেই সৃষ্টি করেছেন।
একটা ছাগল যখন বাচ্চা দেয়, বাচ্চাটির জন্য হলেই দাঁড়িয়ে যায়। যদিও ছাগলবাচ্চাটি দুর্বল থাকে, কাঁপে, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে সবল হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, ও জানে না ওর দুধ কোথায়; কিন্তু ও নিজেই ওর দুধ খুঁজে বের করে। মায়ের পালনে গিয়ে দুধ পান করতে থাকে। তার কাছে এ পরিমাণ ইলম আছে।
এর মোকাবেলায় মানবসন্তানকে আল্লাহ তাআলা এত অল্প ইলম দিয়ে পাঠিয়েছেন যে, ও তো জানেই না ওর দুধ কোথায়, হাত উপরে উঠে যায় আর নিজের আঙুল নিজেই চুষতে থাকে। ও এতটুকুও জানে না যে, এটা চুষলে লাভ নেই। কতক্ষণ চোষার পরেও বোঝে না যে, এর মধ্যে দুধ নেই; এরপরেও চুষতে থাকে। এই জাতীয় বোকামি, নির্বুদ্ধিতা বা জ্ঞানহীনতা মানুষ ব্যতীত কোনো প্রাণীর মধ্যে পাওয়া যায় না।
প্রাণীরা তাদের খাদ্য ব্যতীত অখাদ্য খায় না। ছাগল সম্পর্কে বদনাম রয়েছে যে, ছাগল কি না খায়। ছাগল কিন্তু তার অখাদ্য খায় না। রূপপুর-সহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে তামাকের চাষ হয়। অঞ্চলের লোক যারা এগুলো চাষ করে, তারা একে বাগান বলে—'তামাকের বাগান'। তামাকের বাগানে কোনো বেড়া দিতে হয় না। কারণ, আল্লাহ তাআলা গরু ও ছাগলকে এই ইলম দিয়েছেন যে, এটা কোনো ভালো জিনিস নয়।
এজন্য তারা এগুলো খায় না; অথচ মানুষ এগুলো খায়। বাচ্চারা যখন হামাগুড়ি দেওয়া শেখে তখন বাচ্চার সামনে যা-ই পড়ে সেটাই মুখে দেয়। অথচ ওই ছাগল বা ছাগলের বাচ্চা কখনই বিছুটি পাতা খাবে না। সুতরাং বোঝা গেল, মানুষ তার ইলমের ব্যাপারেও অন্যের মুখাপেক্ষী। ওর জন্য কি খাদ্য বা কি খাদ্য নয়, সেটাও সে নিজে বুঝে না। অতএব, মানুষ বিভিন্নভাবে অন্যের উপর নির্ভরশীল।
এক জায়গায় একই সাথে গৃহস্থের বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হলো এবং গৃহস্থের গাভীরও বাচ্চার জন্ম হলো। যেহেতু গরুর বাছুর বড় হতে বেশিদিন সময় লাগে না, তিন-চার বছর বয়সেই বাচ্চা প্রসবের উপযুক্ত হয়ে ওঠে। তো দুটি বাচ্চার জন্ম হলো, গৃহস্থের গরুর বাচ্চার জন্ম হলো আর তার নিজেরও সন্তান ভূমিষ্ঠ হলো। তো দু-তিন বছর পর ওই গরুর বাচ্চা বড় হয়ে বাচ্চা প্রসব করলো। এখন তার দুধ খাচ্ছে সেই বাছুরটি, অপরদিকে সে মানবসন্তানটি এখনো বাচ্চা, দুধ খায়। আর তার সমবয়সী বাছুরটি বড় হয়ে আরেক বাচ্চা প্রসব করেছে, এখন দুধও দিচ্ছে।
অতএব মানুষ বড়ই নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা দূর করার প্রধানত দুটি পথ। একটি হলো, দুনিয়াদারি বা দুনিয়ার পথ। দ্বিতীয়টি হলো, আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামকে পাঠিয়েছেন, ওটা হলো তার আসল পথ এবং তার দুর্বলতা দূর করার বা অন্যের সাহায্য নেওয়ার পথ।
দুনিয়ার পথ কোনটি? দুনিয়ার পথ হচ্ছে, জিনিস থেকে সাহায্য নেওয়া। ওই যে বললাম গরু, গরুকে দিয়ে হাল চাষ করাবে। এর জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে। ১ম শর্ত, গরু সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে। কারণ, যদি জ্ঞান না থাকে তাহলে গরুর কতটুকু শক্তি, কতটুকু সামর্থ্য রয়েছে—এটি না জানা থাকলে লাঙল বসাতে পারবে না। তার যোগ্যতা-সামর্থ্য ইত্যাদি জানাকে জ্ঞান বলে। সাধারণত এ জাতীয় জিনিসকে বিজ্ঞান বলা হয়। ওই যে জ্ঞান, 'গরুর শক্তি রয়েছে', এটিকে পরবর্তীতে ব্যবহার করা, লাঙল-জোয়াল ইত্যাদি সংযুক্ত করা, -গরুর শক্তি তো আছে, কিন্তু আমি এটা আমার কাজে কিভাবে ব্যবহার করব? সুতরাং জোয়াল, লাঙল ইত্যাদি সংযুক্ত করাকে প্রযুক্তি বলে।
তো দুনিয়ার মানুষ বিভিন্নভাবে এই জিনিসগুলোকে কাজে লাগানোর জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে। প্রথমে চিনতে হবে, চেনার পরে এটাকে উপযুক্ত কাজে লাগাতে হবে। একই গৃহস্থের গরু আছে, কুকুরও আছে; কিন্তু কোনো গৃহস্থ কুকুরকে দিয়ে হাল চাষ করানোর চেষ্টা করে না। আর গরুকে দিয়ে পাহারাদারি করানোরও চেষ্টা করে না। এজন্য যে, তার কুকুর সম্পর্কে জ্ঞান আছে, গরু সম্পর্কেও জ্ঞান আছে। ওই যে বললাম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, এটা জানা থাকার কারণে ' কোনো গৃহস্থ কুকুরকে দিয়ে হাল চাষ করানোর চেষ্টা করে না। আর গরুকে দিয়ে পাহারাদারি করানোরও চেষ্টা করে না। এজন্য যে, তার কুকুর সম্পর্কে জ্ঞান আছে, গরু সম্পর্কেও জ্ঞান আছে। ওই যে বললাম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, এটা জানা থাকার কারণে কুকুরকে দিয়েও হাল চাষ করে না, গরুকে দিয়েও পাহারাদারি করে না। যদি কুকুরকে দিয়ে হাল চাষ করানোর চেষ্টা করে তবে কুকুর তাকে কামড় মারবে। যদিও কুকুর জানে যে, কামড় মারলে তার ঘাড় ভেঙে যাবে। তবুও সে বিনা চেষ্টায় মরবে না; অন্তত একটা কামড় দিয়েও মারা যাবে। এর মোকাবেলায় গরুকে দিয়ে পাহারাদারি করাতে পারবে না। গরুকে যদি পাহারাদারি দেওয়া হয়, তাহলে ওর সামনে দিয়ে চোর যাবে-আসবে আর সে ভদ্রভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে। চোর আসছে-যাচ্ছে—ওর ব্যাপার আমি কেন হায়চায় করব।
অনেক আগে একবার রাজশাহীতে গিয়েছিলাম। ঘুমানোর সময় খেয়াল ছিল না যে, ফজর নামাযের জন্য চাবি রাখতে হবে। তো সকালবেলা উঠে দেখি, সদর দরজা বন্ধ, তো গেট টপকে গেলাম। কুকুর ছিল বাড়িতে কিন্তু কুকুর কিছুই বলল না। যাওয়ার সময় বলল না, ফেরার সময়ও বলল না। সকালে নাস্তার সময় ঘটনা বর্ণনা করে বললাম, কুকুর তো বেশ ভদ্র, কিছুই বলল না। মেজবান বললেন, এটা কুকুরের জন্য কোনো গুণ নয়। কুকুরকে ভদ্রতার জন্য রাখা হয়নি। ওর দায়িত্ব হলো অভদ্রতা করা। সুতরাং কুকুরের মেজাজ হলো, পাহারাদারি করা।
থাইল্যান্ডের প্রচুর সুপারির চাষ হয়। আমাদের দেশেও সুপারির চাষ হয়। এই ঘটনাটি আমি চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করিনি তবে শুনেছি যে, আমাদের দেশের নিয়ম হলো, যখন সুপারি পরিপক্ব হয় তখন গাছ থেকে পেড়ে আনা হয়। আর ওদের ওখানে সুপারি কাটার জন্য বানরকে ব্যবহার করা হয়। এর পদ্ধতি হলো, বানরের হাতে ছুরি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। অবশ্য বানর গাছে গাছে উড়ে বেড়াতে পছন্দ করে। সুতরাং সুপারি পেড়ে আনার কাজটিও তার প্রবৃত্তির সাথে মিলে। তো বানর ছুরি হাতে গাছে উঠে যায়। সুপারি কেটে নিয়ে আসে। এটাও তার প্রবৃত্তির সাথে যায়। যদিও বানর সুপারি খায় না কিন্তু ফলফলাদি ছিড়তে, নষ্ট করতে বেশ পছন্দ করে। এটা তার তরপ্রবৃত্তির সাথে বেশ মিলে। আবার সুপারি পেড়ে নেমে অন্য গাছে ওঠার ঝামেলা না করে সরাসরি লাফ দিয়ে অন্য গাছে চলে যায়। তো এই কাজ যদি কোনো গরুকে দিয়ে করাতে চায়, তাহলে বেচারা গরু পারবে না; কিন্তু বানর পারবে। সুতরাং এই জ্ঞানটুকু জানা হলো, প্রযুক্তি বা বিজ্ঞান।
এরকমভাবে মানুষ অনেক অগ্রগামী হয়ে গিয়েছে। পেট্রোল কে জেনেছে; যদিও পেট্রোল দেখতে পানির মতো মনে হয়, কিন্তু তার বৈশিষ্ট্য একেবারেই ভিন্ন। বৈশিষ্ট্য যে ভিন্ন এতটুকু জানলেই হবে না যে, আগুন লাগালে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে; বরং এটাকে নিজের আওতায় আনতে হবে। এটিকে দিয়ে আমার কাজ করাতে হবে।
গরুর যে শক্তি আছে—এটা জানলেই হবে না; বরং এটাকে দিয়ে আমার কাজ করাতে হবে। বানর গাছে উঠতে পারে, তো বানর যে গাছে উঠতে পারে—এটা জানলে আমার কি লাভ! আমি যেন বানরের গাছে ওঠাকে কাজে লাগাতে পারি—ওই যোগ্যতাকে সাধারণত প্রযুক্তি বলা হয়।
তো ভাই, গরুকে দিয়ে কাজ করানো হয়, বানরকে দিয়ে কাজ করানো হয়... আরো হাজারো জিনিস দিয়ে কাজ করানো হয়। এরকমভাবে পেট্রোল দিয়েও কাজ করানো হয়। পেট্রোল দিয়ে কাজ করাতে গিয়ে ইঞ্জিন আবিষ্কার হয়েছে।
আবার এর জন্য সিলিন্ডার আবিষ্কার হয়েছে, পিস্টন আবিষ্কার হয়েছে... আরো কত জিনিস লেগেছে। যতদিন এর ব্যবহার তৈরি করা যায়নি ততদিন পেট্রোল কোনো কাজের জিনিস ছিল না; বেকার ছিল। দুনিয়ার জিনিস থেকে ফায়দা নেওয়ার অর্থ হলো, বিভিন্ন জিনিসকে জানা এবং জিনিসগুলোর ব্যবহার করতে জানা।
যে যতবেশি এই বিভিন্ন জিনিসের বৈশিষ্ট্য জানে, তাকে তত বড় বিজ্ঞানিক বলা হয়। যে এগুলোকে যত বেশি ব্যবহার করতে পারবে, তাকে ততবেশি প্রযুক্তির উপর দক্ষ বলা হবে। দুনিয়াতে, বিশেষ করে বর্তমান দুনিয়াতে এই দুই জিনিস যার কাছে আছে সে এই দুনিয়ার বাদশাহ। কারণ, যে জিনিস সম্পর্কে জানে এবং ব্যবহার করতে জানে, এতবেশি জানে যে, দুনিয়া তার হাতের মুঠোয়। পূর্বেকার যামানার মানুষ এতটুকুই করতে পারত যে, গরুকে দিয়ে নিজের কাজটুকু করাতো; এর থেকে বেশি দূর চিন্তা করতে পারত না।
অথচ এখনকার মানুষ ঘরে বসে বসে সূর্যকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছে। তার পানি গরম করাচ্ছে, তার ফ্যান চালাচ্ছে... আরো কত কিছু করাচ্ছে। কোথায় সূর্য আর কোথায় সে! আগে যখন গরুর কাঁধে জোয়াল দিয়ে গরুকে দিয়ে তার নিজের কাজ করাচ্ছিল তখন কি আর বুঝতে পেরেছিল যে, সূর্যকে দিয়ে কাজ করানো যাবে? কোথায় সূর্য কোথায় মানুষ! কিভাবে সূর্যের কাছে পানি পৌঁছাবে! কিন্তু জোয়ালের মতো না হোক, ওরকম একটা জিনিস সূর্যের ঘাড়ে বসিয়ে দিয়েছে আর সেটিকে দিয়ে প্রচুর কাজ করিয়ে নিচ্ছে।
বাতাসকে দিয়েও প্রচুর কাজ করানো হচ্ছে। আমাদের দেশে হয়তো এর তেমন প্রচলন নেই, কিন্তু ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় এর ব্যবহার হচ্ছে। 'উইন্ডমেল', বাতাস বয়ে যায় আর তার মাধ্যমে পাখা ঘুরে। পাখা ঘুরলে যেমন বাতাস বের হয়, ঠিক তেমনি বাতাস চললে পাখা ঘরে, আর এভাবে ওর মাধ্যমে বিদ্যুৎ তৈরি হচ্ছে। নর্থ ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়, কিছুদূর পরপর উইন্ডমিলের পাখা ঘুরছে। ফিক্স বাতাস যা আল্লাহ তাআলা প্রবাহিত করছেন, তার মাধ্যমে বিদ্যুৎ তৈরি করছে।
তো দুনিয়ার মানে হলো, জিনিসকে জানা এবং ওর ব্যবহার করা। আরেক ধাপ এগিয়ে বলা যায়, মানুষকে জানা এবং এর ব্যবহার করা যে, কেমন করে মানুষকে জেনে আমি আমার কাজে লাগাতে পারি।
আর এভাবে এতবেশি অন্যের দুর্বলতা বা তাকে বুঝতে পারে যে, তার মাধ্যমে ইচ্ছামতো অনেক কিছু করাতে পারে। দুনিয়াতে এটাকেও এক ধরনের প্রযুক্তি বলা যেতে পারে যে, সে যদি চায় তাকে সরাসরি হত্যা না করে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করাতে পারে। অমুক প্রশ্ন করলো যে, তাকে সরিয়ে দেবে। এখন হত্যা করলে তো ঝামেলা হবে, মামলা-মোকদ্দমা হবে। তার চেয়ে ভালো, তাকে আত্মহত্যা করিয়ে দেই, এভাবে আত্মহত্যায় বাধ্য করলো।
আজকাল দুনিয়াতে মানুষের কায়-কারবারের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য করা। ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় একটা কাজ হলো পণ্য বিক্রি করা। পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে ক্রেতাকে রাজি করাতে হয়। রাজি করাতে গিয়ে ফায়দা দেখাতে হয়। সুতরাং পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে ক্রেতাকে রাজি করাতে এমনকিছু প্রযুক্তি রয়েছে যাকে মার্কেটিং বলে। মার্কেটিং এ প্রেসার ক্রিয়েটিং হয়। এর একটা পদ্ধতি হলো, 'পণ্য এমন, পণ্যটি সেরা', এরকম ফায়দা তুলে ধরে প্রলুব্ধ করা যে, তুমি এটি কিনো। আর আরেকটা হলো, প্রচুর চাপ দিয়ে প্রলুব্ধ করা যে, কিনতেই হবে—বুঝো অথবা না বুঝো।
এক ব্যক্তি কোথাও ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিল। ইন্টারভিউতে তাকে প্রশ্ন করা হলো, 'মার্কেটিং' কাকে বলে?
উত্তরে বলল, 'গ্রীষ্মকালে মরুভূমিতে কম্বল বিক্রি করা।'
আসলেই বিষয়টি এমন। মার্কেটিং যারা জানে তারা ঠিকই তা করতে পারে। যে কম্বল কিনছে তার এ বিষয়টি জানা রয়েছে যে, এই কম্বল তার কোনো কাজেই লাগবে না। তারপরেও কিনলো কেন? কারণ, বিক্রেতা সাময়িকভাবে তার চিন্তা-বোধকে নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিয়েছে, নিজের মুঠোয় নিয়ে নিয়েছে। ওকে চিন্তা করতে দেয়নি, ভাবতেও দেয়নি; বরং তাকে কাবুতে নিয়ে নিয়েছে।
এজন্য মার্কেটিং বা এই জাতীয় কাজ যারা করে, তাদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ক্রেতার হাতে সময় না দেওয়া, চিন্তার সুযোগ না দেওয়া। একটা হাইচই আর ব্যস্ততার মধ্যে বিক্রি করে দেওয়া। সুযোগ শেষ হলে আর পাবেন না, এ রকম প্রলোভন দেওয়া। কিছুক্ষণ পর ক্রেতা বুঝতে পারে যে, আমার তো অনেক টাকা নষ্ট হয়ে গেল। এটা তো আমার কোনো কাজে লাগবে না; কিন্তু যতক্ষণে বুঝতে পারল ততক্ষণে বিক্রেতা নাগালের বাইরে।
তো মানুষ এভাবে দুর্বলতাকে খুঁজে বের করে। গরুর দুর্বলতাকে খুঁজে বের করল। এই যে গরু খেটে মরছে, এতে ওর নিজের কোনো লাভ নেই। জোয়াল রাখার কারণে ঘাড়ে ঘা হয়ে যায়, শরীর দুর্বল হয়ে যায়। খায় খড়, আর এর মাধ্যমে গৃহস্থ পাচ্ছে ভাত। গরুর তো কোনো লাভ নেই।
এমনিভাবে, পেট্রোলের নিজের কোনো লাভ নেই। যদিও বলা যেতে পারে, পেট্রোলের নিজের লাভ-ক্ষতি বোঝার ক্ষমতা নেই। কিন্তু এই যে পেট্রোল গাড়ি দৌড়ালো আর নিজে পুড়ে ছাই হয়ে গেল, এতে নিজের কোন লাভ নেই। সুতরাং অন্যকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে জানা—সে গরু হোক বা পেট্রোল হোক, শেষ পর্যন্ত গিয়ে বেচারা 'মানুষ' হোক।
দুনিয়াকে নিজের স্বার্থে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করতে জানা। তার একটি প্রাচীনতম ব্যবহার হলো, প্রাসাদিক চাবি। রাজা-বাদশাদের হাতে এমন কিছু চাবি থাকত যে, প্রজারা সবসময় বাধ্য হয়ে চলত। রাজারা ডিমান্ডের উপর ডিমান্ড করে যেত, আর প্রজারা তা বাধ্য হয়ে পরিশোধ করত। কোনো কোনো রাজা প্রাচীন কিছু পদ্ধতি প্রয়োগ করত অনুগত রাখার জন্য। এই বিষয়ে বোধহয় ব্রাহ্মণরা যে দক্ষতা প্রমাণ করেছিল, ইতিহাসে এ দক্ষতা কেউ অর্জন করতে পারেনি। বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োग করেছিল। দুনিয়ার সব জায়গায় ঝাড়ু-তে লম্বা হাতল থাকে, যাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সহজে ঝাড়ু দেওয়া যায়। আর এতে পরিশ্রম কম হয়। পরিস্কারিরাদিও কম হয় না, ভালোই পরিস্কার হয়। কিন্তু ঝাড়ুর হাতল ছোট হওয়ার কারণে রুক্ষ অবস্থায় ঝাড়ু দেওয়া বড় কঠিন কাজ, অনেক পরিশ্রম।
দুনিয়ার মধ্যে একমাত্র ভারতবর্ষে কুজো হয়ে ঝাড়ু দেওয়া হয়—এটা ব্রাহ্মণদের আবিষ্কার। নমশূদ্রদের নত হয়ে চলতে অভ্যস্ত করতে, যেন মাথা নত হয়ে থাকে। আর তারা এভাবে থাকতে থাকতে একসময় অভ্যস্ত হয়ে যায়। মনে বিশ্বাস জন্মে যায় আমি ছোট। এই জাতীয় নানান ধরনের বিষয় ছিল। এভাবে একসময় বিশ্বাস করতে থাকে যে, ওদের কথা আমাকে মানতে হবে। তারা এভাবে হাজার বছর ধরে নানা জুলুম করে কিন্তু ব্রাহ্মণ উপর বিশ্বাস থাকার কারণে কোনো আপত্তি করে না। কারণ, অন্তরে বিশ্বাস রয়েছে, ওদের কথাই আমাকে মানতে হবে। আমার উপর তার অধিকার আছে।
আধুনিক দুনিয়ার ইংরেজদের সম্বন্ধে হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ. বলেছেন, আল্লাহ তাআলা এদের মানুষকে ব্যবহার করার জ্ঞান দিয়েছেন। ইংরেজদের সম্বন্ধে বলেছেন যে, তাদের মানুষ সম্বন্ধে জ্ঞান রয়েছে যে, কাকে দিয়ে কোন কাজ কিভাবে করাতে হবে।
গরুকে দিয়ে যেকোনো সময় কাজ করানো যাবে না। এজন্য গরু সম্বন্ধে জ্ঞান থাকা দরকার। যার গরুর সম্বন্ধে জ্ঞান রয়েছে, সে গরুকে দিয়ে কাজ করাতে পারবে। মানুষকে দিয়ে কাজ করাতে হলে মানুষ সম্বন্ধেও জ্ঞান থাকতে হবে। কাকে দিয়ে কোন কাজ হবে? কাকে কোনো বিষয়ে মানাতে হলে কিভাবে বলতে হবে? লোভ দেখাতে হলে কিভাবে লোভ দেখাবে? ভয় দেখাতে হলে কিভাবে ভয় দেখবে? গরুকে ভয় দেখানো বা বাধ্য করা আর কুকুরকে বাধ্য করা মূলত আলাদা আলাদা বিষয়।
গরুকে তার লেজে ধরে চালাতে হয়; কিন্তু কুকুরকে এরকমভাবে লেজে ধরে চালানো সম্ভব হবে না; অন্যভাবে চালাতে হবে। উটকে কিভাবে চালাতে হয়! তার নাকে ধরি বেঁধে টেনে চালাতে হয়। গরুকে তার লেজ চেপে চালাতে হয়।
এভাবে প্রত্যেকের জন্য তার নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে। সব মানুষ এক ধরনের নয়; হাজার মানুষ হাজার ধরনের হয়ে থাকে; তবে সব গরু এক ধরনের হয়, সব উট এক ধরনের হয়, তবে মানুষ হাজার ধরনের। আলাদা আলাদা সংস্কৃতি... কোন জাতি কোন ধরনের! কে লোভে প্রলুব্ধ হবে? কাকে কিভাবে ভয় দেখাতে হবে? ইংরেজরা এগুলো ভালো করেই জানত। সুতরাং কাকে কিভাবে চালাতে হয়—এগুলো জানা আর জেনে এর ব্যবহার করা।
মুসলমানরা যদিও এখনো দ্বীন কম মানে তবে তাদের মাঝে আত্মসম্মান বোধ, যাকে আরবিতে গীরাহ আর উর্দুতে গায়রত বলে—যার অর্থ আত্মসম্মান বোধের কাছাকাছি—অন্যান্য জাতির মাঝে এর মওজুদ খুবই কম। মুসলমানদের মাঝে দ্বীনি সেবা-সহযোগিতার পরিমাণ বেশি। আল্লাহ তাআলা গাইয়্যুর, ঈমানদারও গাইয়্যুর হয়, ঈমানওয়ালা হয়। অনেকগুলো কথা রয়েছে, যে বিষয়গুলোর উপর আমল হয়।
অমুসলমানদের মাঝে এই জিনিস খুব কম। কেউ মা সম্পর্কে খারাপ কথা বলল, তাকে মারবে; একজন মুসলমান নামাজ পড়ে না, রোজা রাখে না, মদ খায়; কিন্তু তার মা সম্পর্কে খারাপ কথা বললে রেগে যাবে; মারবে। মাতাল অবস্থায় থাকলেও রেগে যাবে আর সুস্থ অবস্থায় তো বলাই বাহুল্য।
এর প্রয়োগ হয়েছিল কিছুদিন আগে খেলার মাঠে। মুসলমান খেলোয়াড়; ওকে উত্তেজিত করার জন্য এরকম একটি খারাপ কথা বলেছে আর ও রেগে গিয়ে লাথি মেরেছে।
ফলাফলস্বরূপ, তাকে মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। একজন অমুসলমান যদি হতো তবে সে ভাবত, 'আমার মা সম্পর্কে বলেছে, আমার সম্পর্কে তো কিছু বলেনি।' তো খারাপ অর্থে বা ভালো অর্থে, কাকে কোন ভাবে বোঝাতে হবে, কাকে কিভাবে ব্যবহার করতে হবে, এটা আমাদের জানতে হবে।
চোর-ডাকাত বা দুষ্কৃতিকারীদের কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হলো যে, অমুককে খুন করতে হবে। তাহলে ওই ডাকাতের দায়িত্ব হলো, টার্গেটের আচরণ বোঝা যে, সে কখন ঘর থেকে বের হয়, কখন সে নির্জনে থাকে, কখন সে ফিরে আর এভাবে সুযোগে বুঝে তাকে আক্রমণ করা হবে। তো দুনিয়ার মানুষ সম্পর্কে ওরা এত বিস্তারিত জ্ঞান অর্জন করেছে এবং করেই যাচ্ছে... এভাবে দিন কে দিন আরো বেশি তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মানুষের তথ্য এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি পণ্য। কেউ যদি মানুষের তথ্য দিতে পারে তবে এটি অনেক চড়া দামে বিক্রি করা যায়। আগে মানুষ এটি কল্পনাও করতে পারত না যে, মানুষের ঠিকানা, তথ্য বিক্রির পণ্য হতে পারে; অথচ মানুষের নাম, ঠিকানা ও তথ্য এখন ভালো দামেই বিক্রি হচ্ছে। আর যদি সেই নাম-ঠিকানার সাথে আরো অনেকগুলো তথ্য দিতে পারে, তাহলে আরো বড় মূল্যে বিক্রি করতে পারবে। এগুলো তারা বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা-মার্কেটিং এ কাজে লাগায়। ধরুন আমি কোনো পণ্য বিক্রি করতে চাই... আমার কাজ হবে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে কম্বল বিক্রি করা। এখন লক্ষ্য করতে হবে কার কি মেজাজ, এই বাড়িতে বাচ্চারা আছে কি না? বাড়িতে হিটার আছে কি না? এই সামগ্রিক তথ্যের উপর ভিত্তি করেই কম্বল বিক্রির চেষ্টা করা হবে। সুতরাং পুরো বিশ্ব জিনিস সম্পর্কে তথ্য অর্জন করছে আর এই তথ্যকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে।
আরো একটি বিষয় হলো, যদিও পূর্বের যামানায় ছিল না কিন্তু বর্তমান সময়ে মানুষ এটিকে সম্পদের কাতারে রাখে—যাকে 'জনসম্পদ' বা 'মানবসম্পদ' বলা হয়। আগে ছিল পশু সম্পদ, গরু সম্পদ—যা আমরা ছোটকাল থেকেই শুনে এসেছি। মানুষ সম্পদ! বর্তমান বাজারে এর লেনদেন হচ্ছে। অর্থাৎ, মানুষকেও এখন গরু-ছাগলের মতো সম্পদের কাতারে রাখা হয়েছে। এগুলো এখন বিক্রি হয়, এগুলো দিয়ে ব্যবসা হয়, এগুলো এখন কাজে লাগে। গরুকে কেনার সময় দেখা হয়, এর গোশত কতটুকু আছে? কতটুকু দুধ দিবে? ঠিক তেমনিভাবে এখন মানুষকে বেলায় বিবেচনা করা হয়, সে তো কিছুই জানে না, তাকে বেশি দামে কেনা হয়ে যাচ্ছে না তো! এই হলো পুরো দুনিয়ার হালচাল। এজন্য দুনিয়ার নিয়ম হচ্ছে, মানুষকে জানা এবং সে অনুযায়ী ব্যবহার করা। যে যত বেশি জিনিসকে জানবে, যেমনিভাবে পূর্বে বলা হয়েছে যে, গরুকে জানা; বাতাসকে জানা; পেট্রোলকে জানা আর মানুষকে জানা। যে যতবেশি জানবে আর ব্যবহার করতে পারবে, সে দুনিয়াতে তত বেশি সফল হবে, লাভবান হবে।
আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আ.-কে পাঠিয়েছেন গরুকে জানার জন্য নয়, পেট্রোল কে জানার জন্য নয়, মানুষকে জানার জন্য নয়; বরং দুনিয়ার বিভিন্ন আহওয়াল সম্পর্কে জানা আর আল্লাহ তাআলা থেকে ফায়দা হাসিল করা।
একজন নামাজি লোক ফজরের সময় সম্পর্কে জানে; কিন্তু একজন বে-নামাজি লোক জানে না। এই অর্থে যে, ভোর হওয়া তো একজন কাফেরও জানে আবার বেনামাজিও জানে; কিন্তু একজন নামাজি ব্যক্তি ভোর হওয়াকে যে দৃষ্টিতে দেখে, একজন বেনামাজি সেই দৃষ্টিতে দেখে না। ভোর হলো... একজন দ্বীনদার লোক, একজন নামাজি লোক এই দৃষ্টিতে দেখে যে, এই সময়ের এই হুকুম রয়েছে, এই আমল রয়েছে। আর এর জন্য এই এই ফায়দা রয়েছে। যেমন, একজন ইঞ্জিনিয়ার পেট্রোলের মধ্যে দেখবে যে, এর মধ্যে কি কি শক্তি আছে? আর এটা দিয়ে কি কি কাজ করা যায়। সে সে অনুযায়ী সেই শক্তি ব্যবহার করবে। আগে এগুলোর কার্যকারিতা সম্পর্কে মানুষ জানত না, কিন্তু পরবর্তীতে এর উপকারিতা আবিষ্কার হয়েছে।
মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটমবোমার বিস্ফোরণ। বলা হলো, এক বোতল পানির মাঝে এ পরিমাণ শক্তি রয়েছে যে, এটা জ্বালিয়ে ভস্ম করে দিতে পারে। পানি যে জ্বালিয়ে দিতে পারে—এটা কেউ বিশ্বাসই করবে না। পেট্রোল তো জ্বালাতে পারে; কিন্তু পানি যে জ্বালিয়ে দিতে পারে—এটা কেউ বিশ্বাসই করবে না। তাও মাত্র এক বোতল পানি পুরো বিশ্বকে জ্বালিয়ে দিবে! এই হলো জিনিসকে জানা।
আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া আ.-কে পাঠিয়েছেন অবস্থাকে জানার জন্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবস্থাকে জানতেন। এজন্য যখন ভোর হতো দোয়া পাঠ করতেন,
**الحمد لله الذي اصبحنا**
'আল্লাহ তায়ালার শোকর আদায় করছি যে, তিনি আমাদের ভোর দিয়েছেন।'
মেহেরবানী বা শোকর আদায় করার মানে হলো, তিনি এর মাঝে বিভিন্ন প্রকার উপকার দেখছেন। ভোরের মাঝে এই এই ফায়দা রয়েছে... এ জন্য আল্লাহ তায়ালার শোকর আদায় করছেন। আবার যখন সন্ধ্যা হতো, তখন দোয়া পাঠ করতেন,
**الحمد لله الذي امسانا**
'সব প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার, যিনি আমাদেরকে সন্ধ্যা দান করেছেন।'
শোকর মানুষ কখন আদায় করে? -যখন সেগুলো থেকে উপকার পায়; উপকৃত হয়। সন্ধ্যার মাঝে আল্লাহর রাসূল এত উপকার দেখতেন যে তার জন্য শুকরিয়া আদায় করতেন।
বিষয়টি এত সূক্ষ্ম যে, বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দুনিয়ার মানুষের জন্য বোঝা মুশকিল! যেমন, রমজানের চাঁদ দেখা গেল। এর মানে হলো, মুসলমানরা এখন থেকে আর রাতে-বেলা ভালো করে ঘুমাতে পারবে না; নামাযও বেড়ে গিয়েছে; শেষ রাতে উঠে খাবার খেতে হবে। অর্থাৎ, দু দিকেই ঘুমের সময় কমে গেল। দিনের বেলাও আর ভাত খেতে পারবে না... ইত্যাদি নানা সমস্যা। কিন্তু আল্লাহর মেহেরবানী—বেশিরভাগ মুসলমানের কাছে এবং বেশিরভাগ সমাজে চাঁদ উঠেছে, এই সংবাদ বড়ই খুশির সংবাদ। সবাই বলতে থাকে, 'চাঁদ উঠে গেছে', 'চাঁদ উঠে গেছে...' খুব আনন্দের। কিন্তু বেদ্বীনদের কাছে বিষয়টি বোঝা মুশকিল যে, এতে আনন্দের কি রয়েছে! মূলত আল্লাহ তাআলা এতে মুসলমানের জন্য যে ফায়দা রেখেছেন এবং এর থেকে যে উপকৃত হওয়া যাবে... এটিই বড় আনন্দের। আর সাধারণ মানুষ এটিই দেখে এবং রমযানের সংবাদে আনন্দ বোধ করে।
দ্বিতীয় বিষয় হলো ঈদের চাঁদ দেখা। ঈদের চাঁদ হলো রমযানের বিপরীত। রমজানের বৈশিষ্ট্য হলো, 'খাওয়া যাবে না।' আর ঈদের বিধান ও সুন্নতের মধ্যেই রয়েছে যে, ঈদের নামাজের আগেই খেতে হবে। সাধারণত রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম খেজুর ইত্যাদি মিষ্টান্ন জিনিস খেতেন। সুতরাং ঈদের দিন খেতে হবে, এটা সুন্নত। অতএব, ঈদের চাঁদ দেখা গেল, এটাও মুসলমানদের মাঝে আনন্দের।
একজন অ-মুসলমান একেবারে বিদিশা হয়ে যাবে যে, এদের কোন তাল পাওয়া গেল না! রমজানের খুশিতে যদি আনন্দ হয় তবে তো ঈদে দুঃখী হওয়ার কথা। যেহেতু তার বিপরীত জিনিস; কিন্তু একজন আল্লাহওয়ালার কাছে বিপরীত জিনিস হলেও রমজানে রমজানের ফায়দা... ঈদে ঈদের ফায়দা...। প্রত্যেকটার মধ্যে, প্রত্যেক আহকামের মধ্যে আল্লাহ তাআলা নিজস্ব ফায়দা রেখেছেন। এই হুকুমগুলো আদায় করার মধ্যে আল্লাহ তায়ালা ফায়দা রেখেছেন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে ভোর এবং সন্ধ্যা দুটি ভিন্ন জিনিস।
রাসূল সা. ভোরের সময় শুকরিয়া আদায় করতেন, **الحمد لله الذي اصبحنا** আর সন্ধ্যায় শুকরিয়া আদায় করতেন, **الحمد لله الذي امسانا** যদিও দেখতে বিপরীত, যেহেতু দুটি বিপরীতমুখী দিক থেকে উদয়-অস্ত হয়। অন্য অর্থে মোটেই বিপরীত নয়; বরং সমান সমান।
কারণ, সকালবেলা আল্লাহর কিছু আহকাম আছে, যেগুলো যদি আমি আদায় করি তবে উপকৃত হবো। তেমনিভাবে সন্ধ্যাবেলা কিছু আহকাম আছে, যদি সেগুলো আমি আদায় করি তাহলে খুবই উপকৃত হবো। এ কারণে উভয়টিতে উপকৃত হবো।
আল্লাহ তাআলা প্রতি মুহূর্তে কিছু পরিবর্তন ঘটাচ্ছেন। কিছু ঘটনা ঘটছে আর নতুন কিছু তৈরি হচ্ছে। এই নতুন ঘটনার সাথে আল্লাহ তাআলা তার রহমতকে নতুন করে নাযিল করছেন। ওই রহমতগুলো যখন কারো দিকে ধাবিত হয়, তখন তা কোনো হুকুমের সুরতে ধাবিত হয়।
আমাদের দেশে প্রচলিত রয়েছে, সরকার যখন কোনো গরিবকে সাহায্য করতে চায়, তখন সরাসরি না করে কাজের বিনিময়ে সাহায্য করে। এর পোশাকি নাম 'কাজের বিনিময়ে খাদ্য।' আসল কিন্তু কাজ নয়, আসল হলো খাদ্য দেওয়া। কিন্তু খম দেয়ার জন্য সুবিধাজনক বন্টন পদ্ধতি হিসেবে কাজের লেভেল লাগায় যে, এখানে খাল কাটতে হবে... এখানে মাটি কাটতে হবে... ইত্যাদি ইত্যাদি।
বড় আগের কথা, দেশে তখন দুর্ভিক্ষ চলছিল। সে সময় এক ধনাঢ্যশীল বড় মনের মানুষ, যার জমিজমাও ছিল বেশ। দুর্ভিক্ষের কারণে চারদিকে হাহাকার, অভাব-অনটন। তিনি ইচ্ছা করলেন, মানুষকে সহযোগিতা করবেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি ঠিক এ সময়ই বাড়ির কাজ, মাটিকাটা ইত্যাদি কাজ আরম্ভ করলেন। উদ্দেশ্য, বাড়ি নির্মাণের নামে মানুষকে সহযোগিতা করা। নচেৎ, এমনি এমনি টাকা দেওয়া মুশকিল। ভিড় লেগে যাবে, ঝামেলা সৃষ্টি হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এ কারণে বাড়ি নির্মাণ শুরু করলেন, যাতে মানুষ যেন কিছু কিছু কাজ পায় আর কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক স্বরূপ কিছু অর্থ আয় করতে পারে। এ তো ছিলো মানুষের প্রচেষ্টা আর আল্লাহ তাআলা বান্দার ক্ষেত্রেও এমন অনেক অনেক সুযোগ রেখেছেন। আল্লাহ তাআলার পদ্ধতির তো কোনো তুলনাই হয় না। আল্লাহ তাআলা যে মানুষকে দান করেন, এই দানটি তিনি করেন কোনো না কোনো হুকুমের মাধ্যমে। আল্লাহর রহমত আসে আদেশের সুরতে। নামায, এটি বড় রহমত যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটি আদেশ। ঠিক তেমনিভাবে রোযাও বড় রহমতের, কিন্তু বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটি আদেশ। এই আদেশ পালনার্থে আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন।
তাহাজ্জুদ সম্পর্কে ও এ ধরনের বিভিন্ন আমল সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আসমানে এসে হাত প্রসারিত করে ডাকেন, 'কে আছ মাগফিরাত চাইবে, আমি তাকে মাগফিরাত দিবো।' মাগফিরাত তথা ক্ষমা উদ্দেশ্য; কিন্তু শর্ত দিয়েছেন, মাগফিরাত চাইতে হবে। এটি আদেশ। কেউ রিযিক চাইলে আমি তাকে রিযিক দিবো। দিতে চান, দিতে প্রস্তুত; কিন্তু আদেশ দিয়েছেন, তোমাকে চাইতে হবে।
আল্লাহ তাআলা প্রতি মুহূর্তে নতুন অবস্থা আনছেন আর এই নতুন অবস্থার সাথে আল্লাহ তাআলার কিছু আহকাম জড়িত, যেগুলো বান্দার দিকে ধাবিত। প্রতিটি হুকুম আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে বান্দার জন্য অসংখ্য রহমত নিয়ে আসে। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, **كُلَّ يَوْمٍ هُوَ فِيْ شَأن** 'প্রতি মুহূর্তে আল্লাহ তাআলার সিফাতগুলো আবার নতুন করে প্রকাশ পায়।' আল্লাহ তাআলা রাযযাক (রিযিকদাতা)। এমনটি নয় যে, আল্লাহ তাআলা একবার রিযিক দিয়ে থেমে গিয়েছেন; বরং প্রতি মূহূর্তে, প্রতিটি বান্দার দিকে আল্লাহ তাআলার এই সিফাতগুলো ধাবমান। আল্লাহ তাআলা রাহমান, রাহীম। প্রতি মুহূর্তে বান্দার দিকে আল্লাহ তাআলার এই সিফাতগুলো ধাবিত। একবার বলা হয়েছে, এরপর শেষ হয়ে গিয়েছে—এমন নয়।
প্রতি মুহূর্তে বলছেন, বারংবার করে বলছেন। আবার বলছেন বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে। বড় বড় কিছু বিষয়, যেগুলো চাক্ষুষ হয়, এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বলছেন। যেমন, সূর্য উদয় হয়—এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বলছেন।
রমযানের চাঁদ উঠে, এর মাধ্যমে কিছু বলছেন; ঈদের চাঁদ উঠে, এর মাধ্যমে কিছু বলছেন। আল্লাহ তাআলার বলা ওই সূর্য উদয়-অস্ত আর রমযানের চাঁদের সাথে শুধু জড়িত নয়, বরং প্রতি মুহূর্তে কিছু না কিছু ঘটছে, আর আল্লাহ তাআলাই ঘটাচ্ছেন। আর এই প্রত্যেক ঘটনাই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আদেশ। সুতরাং মুমিনের কাজ হলো, আল্লাহ তাআলার এই আদেশগুলোকে চিনতে পারা আর এর থেকে ফায়দা নেওয়া।
দুনিয়া যেরকম, জিনিসকে চেনে এবং তার থেকে ফায়দা নেয়, সেরকমভাবে মুমিনের উচিত, আল্লাহ তাআলার হুকুম আহকামের এই সময়গুলোকে চেনা আর এর থেকে ফায়দা নেওয়া। যে জিনিসকে চিনতে পারে, সে ফায়দা নেয় আর যে জানে না আর অবহেলায় ফেলে রাখে সে ফায়দা নিতে পারে না।
আমাদের দেশের মাটি যেমন খুবই উর্বর, সামান্য বৃষ্টি হলেই সব আগাছাতে ভরে যায়। সাধারণত এগুলোকে দূর করার চেষ্টা করে, কেটে ফেলে দেয়, সাফ-সুতরো করে; কিন্তু বৃষ্টি হলেই আবার আগাছাতে ভরে যায়। তেমনি এক সময়ে একজনের বন্ধু আসলো। বন্ধুকে সাথে করে ঘরে নিয়ে যাচ্ছে। সে লক্ষ্য করছে যে, আশপাশে প্রচুর আগাছা, পতিত পাতাতে ভরে রয়েছে। মেযবান খুব বিরক্তি প্রকাশ করে বলছে, এগুলোর জ্বালায় বাঁচি না। কিছুদিন আগেও পরিষ্কার করলাম, এখন আবার আগাছায় ভরে গিয়েছে। বন্ধু ছিল দক্ষ কবিরাজ। সে পাতাগুলোর দিকে অবাক চোখে তাকাচ্ছিল। অতঃপর বন্ধুর কথা শুনে বললো, আরে শর্বনাশ! তুমি এগুলোকে ফেলনা মনে করছ! তুমি জানো, এগুলো কত মূল্যবান! এগুলোর মাঝে কি কি ঔষধ লুকায়িত আছে! এরচে বড় সম্পদ দুনিয়াতে আর কি আছে। তাহলে মেযবান দেখছে, এগুলো আবর্জনা, এগুলোর ঝামেলা দূর করা যাচ্ছে না। আর পাশাপাশি দক্ষ বন্ধুর দৃষ্টিতে এগুলো বিরাট সম্পদ।
ইউরোপীয় এক ভ্রমণপিপাসু নেপালে গিয়েছিল। নেপালে ছিল পুরোনো সেগুন গাছ, যেগুলো কাঠ হিসেবে পুরো দুনিয়াতে একটি উৎকৃষ্ট পণ্য। সে লক্ষ্য করল, নেপালিরা কুড়াল দিয়ে কেটে কেটে সে গাছগুলোর লাকড়ি বানাচ্ছে আর বিরক্তি প্রকাশ করছে যে, কত শক্ত কাঠ! কাটাই যাচ্ছে না! আবার কুড়ালের আগাও ভেঙে যাচ্ছে। এরচেয়ে শিরিষ কাঠ হলেও ভালো হতো। অনেক সহজে লাকড়ি বানানো যেত। আবার এটি লাকড়ি হিসেবেও নিম্নমানের লাকড়ি। যখন সে পর্যটক দেখলো যে, তারা এই কাঠকে লাকড়ি বানাচ্ছে। আবার এতে তারা বিরক্তও বটে যে, এটি নিম্ন মানের লাকড়ি, ভালো করে কাটাও যায় না। তখন সে বড় অবাক হলো, এত উৎকৃষ্ট ও মূল্যবান সম্পদ অথচ তারা এটি জানেই না। সুতরাং দুনিয়ার মানেই হলো, জিনিসকে জানা... জানা মানে হলো, এর মাঝে কি কি ফায়দা লুকায়িত আছে, তা জানা।
যারা জানে, তারা সেসব অঞ্চলে গিয়েছে আর সেগুলো থেকে হাজার হাজার ফায়দা বের করেছে। আল্লাহ তাআলা ইউরোপের মানুষদেরকে জিনিসের জ্ঞান দান করেছেন। আর তারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়েছে।
আফ্রিকায় গিয়েছে, এশিয়ায় এসেছে, আমাদের দেশেও এসেছে। তারা এসে এই জ্ঞান-বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে যে, কোন জিনিস দিয়ে কোন জিনিস তৈরি হয়। যেমন ধরুন এই চা বাগান। ইউরোপে অতীতে চা-এর বাগান ছিল না। ইউরোপের মানুষ এগুলো লাগিয়েছে। এখন মানুষ এগুলো করে।
তো জিনিসকে জানা আর জিনিস থেকে ফায়দা নেওয়া, এগুলো হলো দুনিয়ার মানুষের কাজ। আল্লাহ তাআলা আম্বিয়ায়ে আ.-কে পাঠিয়েছেন, অবস্থাকে জানা যে, কোন অবস্থা আল্লাহ তাআলার কোন হুকুম বহন করে।
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার আহকামকে জানা আর আহকামকে পালন করি
Cliquez ici pour réclamer votre Listage Commercial.
Type
Contacter l'entreprise
Téléphone
Site Web
Adresse
Paris
Paris
93200